উপমহাদেশের সর্ববৃহৎ দিপালী উৎসবকে কেন্দ্র করে উৎসব মুখর বরিশাল

কৃষ্ণ দাস ॥
উপমহাদেশের সর্ববৃহৎ দিপালী উৎসবকে কেন্দ্র করে বরিশাল নগরীর মহাশ্মশানকে প্রস্তুত করা হচ্ছে। দু’শ বছরের ঐতিহ্যবাহী এ উৎসবকে কেন্দ্র করে নেয়া হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা বলয়। প্রতি বছর ভূত চতুর্দ্দশী পুন্য তিথিতে এ উৎসব হয়ে থাকে। দিপালী উৎসব ও মহাশ্মশান রক্ষা কমিটির সভাপতি মানিক মুখার্জী কুডু ইত্তেফাককে জানান- এ বছর তিথি অনুযায়ী ২৬ অক্টোবর শনিবার দিপালী উৎসব অনুষ্ঠিত হবে এবং পরদিন রবিবার শ্মশান কালীপূজা অনুষ্ঠিত হবে। তিনি জানান দু’শ বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী এ উৎসবকে কেন্দ্র করে সকল প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্নের পথে। এ বছরই প্রথম বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারের উদ্যোগে এ উৎসব উপলক্ষে আইন-শৃংখলা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। গত সোমবার বিএমপি’র কমিশনারের কার্যালয়ে এ সভায় পুলিশ কমিশনার মোঃ শাহাবুদ্দিন খান যে কোনো ধরনের অনাকাঙ্খিত ঘটনা এড়াতে নিরাপত্তা বলয় প্রস্তুত করা হয়েছে। পাশাপাশি নির্বিঘেœ এ উৎসব পালনের লক্ষ্যে সিটি কর্পোরেশন, বিদ্যুৎ বিভাগ, ফায়ার সার্ভিস সহ সংশ্লিষ্ট বিভাগের উর্ধ্বতনদের নিয়ে এ সভায় নানান সিদ্ধান্ত গ্রহন করা হয়েছে।
১৯৯৭ সাল থেকে মহা শ্মশান রক্ষা কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা বর্তমান সভাপতি মানিক মুখার্জী কুডু জানান, ১৯৯৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত মহাশ্মশানে কোটি টাকার বেশী উন্নয়ন কাজ করা হয়েছে। শ্মশানের অভ্যন্তরে কালি মন্দির, দু’টি গেট, শিব মূর্তি নির্মাণ করা হয়েছে। পুকুরের সানবাঁধানো ঘাটলায় টাইলস দিয়ে কারুকার্য করে শোভা বর্ধন সহ নানান উন্নয়নে মহাশ্মশান হয়ে উঠেছে এখন পর্যটক আকর্ষণের কেন্দ্র হিসেবে। পুরাকৃতী আর দৃষ্টি নন্দন এ পবিত্র স্থানটি শুধু হিন্দু সম্প্রদায় নয়, সকল সম্প্রদায়ের লোকজনকেই এখন সেখানে টেনে নিয়ে যায়। পড়ন্ত বিকেলের ছায়াঘেরা পরিবেশে সেখানে পূর্বপুরুষের সমাধি দেখার পাশাপাশি প্রাচীন কালের এ মহাশ্মশান দেখতে মানুষের ভিড় বাড়ে। হাজারো সমাধির মাঝ দিয়ে বেশ কয়েকটি সরু সড়ক তৈরী করা হয়েছে। অনেকটা পার্কের মত। সড়কের পাশেই তৈরী করা হয়েছে বেঞ্চি। বয়ঃ-বৃদ্ধরা হাটতে গিয়ে ক্লান্ত বোধ করলে বেঞ্চিতে বসে বিশ্রাম নেন। অনেকে আবার পিতা মাতার সমাধির কাছে বসে কিছু সময় অতীত স্মৃতিতে হাতরে বেড়ান। এ মহশ্মশানে রয়েছে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের অগ্নিপুরুষ বিল্পবী দেবেন ঘোষ, ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের নেত্রী মনোরমা মাসিমা, শিক্ষাবিদ কালি চন্দ্র ঘোষসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের সমাধি।
নগরীর পশ্চিম কাউনিয়া ও নতুন বাজার এলাকায় ৬ একর জমির উপর এ মহাশশ্মানের জন্ম বরিশাল নগরীর পত্তনের পূর্বেই। ইতিহাস থেকে জানা যায় ধর্ণাঢ্য জমিদারদের আর্থিক সহায়তায় নতুন বাজারে প্রথম মহাশ্মশান স্থাপিত হয়। পরে তা কাউনিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। কালের বিবর্তনে কাউনিয়ার শ্মশানটির উন্নয়ন হলেও নতুন বাজারের প্রায় এক একর শ্মশানের জমি বেদখল হয়ে গেছে। পুরনো শ্মশানের অধিকাংশ সমাধি ধংস হয়ে গেলেও এখনো সেখানে ব্রাক্ষ্মদের ২/৩টি সমাধি রয়েছে। তার পাশেই রূপসী বাংলার কবি জীবনান্দ দাশের পিতা সত্যানন্দা দাশ ও পিতামহ সর্বানন্দা দাশের সমাধি এখনো টিকে আছে। এছাড়াও এ মহাশশ্মানে মৃত্যুর ৮০ বছর পর ঠাই হয়েছে মহাত্মা অশ্বিনী কুমার দত্তের সমাধি। ২০১২ সালে ভারতের কেওড়া তলা মহাশ্মশান থেকে চিতাভস্য এনে এ মহামশশ্মানে স্থাপন করা হয়েছে। মহাশ্মশান কমিটির নেতৃবৃন্দ জানান, নতুন পুরনো মিলিয়ে এখন ঐ মহাশশ্মানে সমাধি প্রায় ৬০ হাজার। এর মধ্যে এক হাজার সমাধির মঠ এখন বেওয়ারিশ। এদের বংশধররা পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতসহ বিভিন্ন দেশে চলে গেছেন। পুরনো বেওয়ারিশ মঠগুলোকে এবার প্রথমবারের মতো সংস্কার করে যে ক’টির সন্ধান মিলেছে তাতে খোদাই করে পরিচয় লেখা হয়েছে। সে পরিচয়ের সন্ধানে বেশ কয়েকজন পূর্ব পুরুষদের সন্ধান পেয়েছেন বলে আয়োজক কমিটি সূত্র জানায়। মৃত্যুর পর এখানে লাশ দাহ করতে সিটি কর্পোরেশনকে ৬০ টাকা করে নির্ধারিত হারে ফি দিতে হয়। শ্মশান কমিটিকে ২ হাজার টাকা এবং গরিব লোক জনের জন্য তা মওকুফ করার বিধান রয়েছে। এছাড়াও শিশুদের দাহ না করে এ মহাশ্মশানের মধ্যে আলাদা স্থানে মাটি দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। মৃত্যুর পর নাম রেজিস্ট্রারেরও ব্যাবস্থা রয়েছে সেখানে। সিটি কর্পোরেশনের দু’জন কেয়ারটেকার শ্মশানের দেখভাল করেন। কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে শ্মশান এলাকায় স্ট্রিট লাইট বসানো ও দেয়াল নির্মাণ করা হয়েছে। শুধু সিটি কর্পোরেশন নয় শ্মশানের উন্নয়নে নগরীর দানশীল ব্যক্তিদের ভূমিকাই বেশি।