একে একে বিকল হচ্ছে বিআইডব্লিউটিসির নৌযান

ঢাকা থেকে দক্ষিণাঞ্চলের নৌপথে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিসি) নৌযান একের পর এক বিকল হচ্ছে। গত ১৫ দিনের ব্যবধানে ঐতিহ্যবাহী প্যাডেল স্টিমার পিএস মাহসুদ এবং এক সপ্তাহের ব্যবধানে লেপচা বিকল হওয়ায় মুখ থুবড়ে পড়েছে যাত্রীসেবা। সর্বশেষ গত দেড় বছর পূর্বে প্যাডেল স্টিমার পিএস অস্ট্রিচ ভাসমান রেস্তোরাঁ ও পানশালা করার জন্য ইজারা দেয় বিআইডব্লিউটিসি।

বর্তমানে বিআইডব্লিউটিসি ঢাকা থেকে দক্ষিণাঞ্চলে যাত্রী পরিবহনের জন্য পাঁচটি জাহাজের মধ্যে এমভি বাঙালী ও মধুমতি ব্যতীত বাকি পিএস মাহসুদ, টার্ন ও লেপচা প্যাডেল স্টিমার। ব্রিটিশ আমলে নির্মিত এসব প্যাডেল স্টিমারগুলোতে ঐতিহ্য, পর্যটন, মৌসুমে নিরাপদ যাত্রী পরিবহনের কথা বিবেচনায় রেখে ট্রিপে রাখা হলেও কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় বিকল হচ্ছে স্টিমার। বিআইডব্লিউটিসির চিফ ইঞ্জিনিয়ার এম এ গফুর সরকার জানান, ১৫ দিন পূর্বে বিকল হওয়া পিএস মাহসুদ মেরামতে এক মাস সময় লেগে যাবে। এছাড়াও গত এক সপ্তাহ পূর্বে বিকল লেপচা আগামী তিন মাসেও সার্ভিসে আসতে পারবে না। ফলে সপ্তাহে সোম ও বৃহস্পতিবার মধুমতি ও বাঙালী এবং বুধবার টার্ন ঢাকা থেকে দক্ষিণাঞ্চলের মোরেলগঞ্জ পর্যন্ত যাত্রী পরিবহন করবে। বিআইডব্লিউটিসির বরিশালের সহ-মহাব্যবস্থাপক সৈয়দ আবুল কালাম আজাদ জানান, ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা জাহাজ চাঁদপুর, বরিশাল, ঝালকাঠী, কাউখালী, হুলারহাট, চরখালী, বড় মাছুয়া, সন্যাসী ও মোরেলগঞ্জে যাত্রী পরিবহন করে। এ রুটে নিয়মিত যাত্রীরা জানিয়েছেন, একমাত্র সরকারি জাহাজ মোরেলগঞ্জ পর্যন্ত যাত্রী পরিবহনে ছিল। সপ্তাহে তিন দিন সার্ভিসে থাকায় মোরেলগঞ্জ থেকে যাতায়াতকারী যাত্রীদের বাকি তিন দিন যাতায়াতের সুযোগ থাকছে না। এক সময়ে খুলনা পর্যন্ত সরকারি সার্ভিস থাকলেও বর্তমানে মোরেলগঞ্জ পর্যন্ত যাতায়াত করতে পারলেও সপ্তাহের চার দিনই বন্ধ থাকছে। মোরেলগঞ্জ থেকে কোনো বেসরকারি নৌযান লঞ্চ পরিচালনা না করায় যাত্রীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয় সরকারি সার্ভিস বন্ধের দিন। যাত্রীরা জানান, বৈরী আবহাওয়ায় উত্তাল নদীতে যাতায়াতে তাদের বেসরকারি লঞ্চের চেয়ে সরকারি নৌযানের ওপর ভরসা বেশি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইতিপূর্বে ঢাকা থেকে দক্ষিণাঞ্চলগামী ঐতিহ্যবাহী প্যাডেল স্টিমার ও নৌযান এমভি সোনারগাঁও পানশালায় দীর্ঘ মেয়াদের ইজারায় রয়েছে। গত দেড় বছর পূর্বে ঐতিহ্যবাহী প্যাডেল স্টিমার পিএস অস্ট্রিচ এবং ২০১৬ সাল থেকে এমভি সোনারগাঁও রাজধানীর সন্নিকটে পানশালায় পরিণত হওয়ায় মুখ থুবড়ে পড়ে যাত্রীসেবা। সরকারি সার্ভিস ক্রমেই কমতে থাকায় বেসরকারি নৌযানের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে দক্ষিণাঞ্চলের যাত্রীরা।

বরিশাল-ঢাকা নৌরুট লাভজনক হওয়ায় বেসরকারি লঞ্চ কোম্পানি একের পর এক বিলাসবহুল লঞ্চ বহরে যুক্ত করলেও সরকারি জাহাজ বিকল হয়ে সার্ভিস বন্ধ থাকছে। সরকারি জাহাজের অব্যবস্থাপনা, সময়সূচিতে যাত্রীদের বিড়ম্বনা, ঘাটগুলোর বেহালদশা, তিন শ্রেণির কেবিনের বেহালদশায় যাত্রীদের ভোগান্তির আর শেষ থাকে না। দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন রুটে যাত্রী আকর্ষণে বিলাসবহুল লঞ্চ কোম্পানিগুলো লঞ্চ যুক্ত করে যাত্রী পরিবহনে দিয়ে থাকলেও সাধারণ মানুষ সরকারি জাহাজের যাত্রী হতে আগ্রহী। অথচ সরকারি স্টিমারের জন্য ব্যবহূত ঘাটের সর্বত্রই থাকে নোংরা পরিবেশ। সেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও প্রায়ই মাঝনদীতে যান্ত্রিক ত্রুটির সম্মুখীন হতে হয় যাত্রীদের। ফলে পুরো ফায়দা লুটে নিচ্ছে বেসরকারি নৌযান মালিকরা। সরকারি স্টিমার নৌ-টার্মিনালে না থাকায় বিলাসবহুল লঞ্চের পাশাপাশি লক্কড়-ঝক্কড় লঞ্চগুলো যাত্রী পরিবহনের পাশাপাশি বাড়তি ভাড়া আদায় করে থাকে।

সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) বরিশাল জেলার সভাপতি প্রফেসর শাহ্ সাজেদা বলেন, ব্রিটিশ আমলে তৈরি ঐতিহ্যবাহী প্যাডেল স্টিমার বন্ধ হয়ে গেলে পর্যটকদের পাশাপাশি নিয়মিত যাত্রীদের দুর্ভোগের সীমা থাকবে না।