জীবনানন্দ দাশ : কবিতা এবং দারিদ্র্যতা

জীবনানন্দ দাশের একমাত্র পরিচয় তিনি কবি। তার মা কুসুম কুমারী দাশও ছিলেন সাহিত্যের অনুরাগী। মায়ের প্রভাবেই জীবনানন্দ ছোটবেলায় বেশ কয়েকটা পদ্য লিখেছিলেন। পদ্য মানে কবিতা। আমরা এখন আর কবিতাকে পদ্য বলিনা। ১৯১৯ সালে বরিশাল থেকে প্রকাশিত ব্রহ্মবাদী পত্রিকায় তার প্রথম পদ্য (কবিতা) ছাপা হয়। নাম ছিল বর্ষা আবাহন।

সাতটি তারার তিমির প্রকাশিত হওয়ার পর তার বিরুদ্ধে দুবোর্ধ্যতার অভিযোগ ওঠে। নিজ কবিতার অবমূল্যায়ন নিয়ে জীবনানন্দ খুব ভাবিত ছিলেন। কবি নিজেই তার রচনার মর্মকথা একটু প্রাঞ্জল এবং সাবলীল ভাষায় প্রকাশ করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছিলেন যদিও শেষাবধি তা আর সম্ভব হয়ে ওঠেনি। তবে কবি নিজেই নিজ রচনার কড়া সমালোচক ছিলেন। জীবনানন্দ দাশ জীবদ্দশায় প্রায় সাড়ে আটশ’র বেশি কবিতা লিখলেও মাত্র ২৬২ টি কবিতা পত্রিকায় দিয়েছিলেন প্রকাশের জন্য। অর্থের প্রয়োজনে বেশ কিছু প্রবন্ধ লিখেছিলেন এবং প্রকাশ করেছিলেন। মনোতৃষ্ণা মেটাতে বেশ কিছু গল্প উপন্যাস লিখলেও প্রকাশের ব্যবস্থা নেননি কবি।

জীবনানন্দ দাশ বিংশ শতাব্দীর আধুনিক বাঙালি কবি। বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার ছোঁয়া দিয়েছেন যে ক’জন কবি সাহিত্যিক জীবনানন্দ দাশ তন্মধ্যে অন্যতম। বর্তমান সময়ের একজন জনপ্রিয় কবির নাম জীবনানন্দ দাশগুপ্ত (মিলু)। গ্রামবাংলার ঐতিহ্যময় নিসর্গ ও রূপকথা-পুরাণের জগৎ জীবনানন্দের কাব্যে হয়ে উঠেছে চিত্ররূপময়। একারণেই তিনি ‘রূপসী বাংলার কবি’ অভিধা পেয়েছেন। বুদ্ধদেব বসু তাকে নির্জনতম কবি বলেছেন। অন্নদাশঙ্কর রায় তাকে ‘শুদ্ধতম কবি’ অভিধা দিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল-পরবর্তী বাংলা সাহিত্যের প্রধান কবি বলতে আমরা জীবনানন্দ দাশকেই বুঝে নেই।

যৌবনের প্রারম্ভেই আমরা জীবনানন্দের কবি প্রতিভা লক্ষ্য করছি। ১৯২৫ খ্রিষ্টাব্দে তার প্রথম প্রবন্ধ ‘স্বর্গীয় কালীমোহন দাশের শ্রাদ্ধবাসরে’ বরিশালের ব্রাহ্মবাদী পত্রিকার পরপর তিনটি সংখ্যায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। ঐ বছরেই কল্লোল পত্রিকায় ‘নীলিমা’ কবিতাটি প্রকাশিত হলে তা অনেক তরুণ কাব্যরসিকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। অত:পর ঢাকা, কলকাতা এবং অন্যান্য জায়গা থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন সাহিত্যপত্রিকায় তার লেখা ছাপা হতে থাকে; যেগুলির মধ্যে ছিল সে সময়কার সুবিখ্যাত পত্রিকা কল্লোল, কালি ও কলম, প্রগতি প্রভৃতি। ১৯২৭ খ্রিষ্টাব্দে কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ঝরা পালক’ প্রকাশিত হয়। সে সময় থেকেই তিনি তার পারিবারিক উপাধি ‘দাশগুপ্তের’ বদলে কেবল ‘দাশ’ লিখতে শুরু করেন। জীবনানন্দ দাশ’র জীবন কেটেছে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে। কবিতা এবং দরিদ্র্যতা কবির সাথে মিশেছিল আজীবন। জীবদ্দশায় এরা কেউই ছেড়ে যায়নি কবিবে।

শুদ্ধতম এই কবির ১২১ তম জন্ম বার্ষিকী আজ ১৭ ফেব্রুয়ারি সোমবার। কবির প্রতি বিন¤্র শ্রদ্ধা জানিয়ে গতকাল ১৬ ফেব্রুয়ারি বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ ভিত্তিক সংগঠন ‘উত্তরণ’ শুরু করেছে তিন দিনব্যাপী ‘জীবনানন্দ মেলা’। আজ সকাল ৮ টা ৩০ মিনিটে প্রগতি লেখক সংঘ, বরিশাল জেলা কমিটি এবং জাতীয় কবিতা পরিষদ কবির জন্মদিনে পুষ্পিত শ্রদ্ধা জানিয়েছে জীবনানন্দ সড়কের জীবনানন্দ অঙ্গণের প্রতিকৃতিতে। বাংলা সাহিত্যের এই আধুনিক কবির জন্মদিনে শ্রদ্ধা ভালোবাসা অবিরাম।

অপূর্ব গৌতম
সম্পাদক, মালবিকা (সাহিত্যের ভাঁজপত্র)
০১৭৬৮-৯৫৫৩০১