দাঙ্গা-হাঙ্গামা, কেন্দ্র দখল, ব্যালট ছিনতাই অর্ধশত চেয়ারম্যান প্রার্থীর ভোট বর্জন

শাহীন হাফিজ ।। ভোট কেন্দ্র দখল, ব্যালট ছিনতাই ও সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে গতকাল মঙ্গলবার জেলার ৭৪টি ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। ব্যালট পেপার ও ব্যালট বাক্স ছিনতাইয়ের ঘটনায় ৫টি ভোট কেন্দ্রের ভোট গ্রহণ স্থগিত করা হয়েছে। দাঙ্গা-হাঙ্গামার কারণে আরো বেশ কয়েকটি কেন্দ্রের ভোট গ্রহণ বন্ধ ছিলো। আওয়ামীলীগ মনোনীত প্রার্থী ও সমর্থকদের বিরুদ্ধে ভোট কেন্দ্র দখল সহ তান্ডবের অভিযোগ এনে অর্ধশত চেয়ারম্যান প্রার্থী নির্বাচন বর্জন করেছেন। গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৮টায় বিপুল সংখ্যক ভোটারের উপস্থিতিতে জেলার ৭৪ টি ইউনিয়নের ৬৭৭টি কেন্দ্রে একযোগে ভোট গ্রহণ শুরু হয়। উৎসব মুখর পরিবেশে নবীন-প্রবীণ সহ বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষ ভোটারদের দীর্ঘ লাইনে দাড়িয়ে ভোট দিতে দেখা গেছে। সকাল ১০টার পর থেকেই পাল্টে যায় পরিস্থিতি। একের পর এক ভোট কেন্দ্র দখলসহ ব্যালট পেপার ছিনতাই আর সংঘর্ষের ঘটনা পাল্টে দেয় শান্তিপূর্ণ ভোটের দৃশ্যপট। ভোট দিতে আসা সারিবদ্ধ ভোটারদের লাইন কিছুক্ষণের মধ্যেই জনশূন্য ভোট কেন্দ্রে রূপ নেয়। ভোট দিতে আসা নারী-পুরুষ আতংকিত হয়ে যার যার বাড়ি-ঘরে ফিরে যান। সদর উপজেলার রায়াপাশা-কড়াপুর ইউনিয়নের পপুলার মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে জোরপূর্বক আওয়ামীলীগের চেয়ারম্যান প্রার্থী হাবিবুর রহমান খোকনের কর্মীরা অবস্থান নিয়ে জাল ভোট দিতে থাকে। বিএনপি প্রার্থীর এজেন্টরা প্রতিবাদ জানালে তাদের মারধর করে বের করে দেয়া হয়। এ নিয়ে উভয়ের মধ্যে সংঘর্ষ হলে ভোট গ্রহণ স্থগিত করা হয়। এছাড়াও উজিরপুর উপজেলার হারতা ইউনিয়নের জামবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বাবুগঞ্জ উপজেলার কেদারপুর ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ড, একই উপজেলার রহমতপুরের রামপট্টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার চুনাছরি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভোট কেন্দ্রে গোলযোগ সৃষ্টির অভিযোগে প্রিজাইডিং অফিসার ভোট গ্রহণ স্থগিত করেন।
কাশিপুর ইউপি’র আওয়ামীলীগ দলীয় চেয়ারম্যান প্রার্থী কামাল হোসেন লিটন মোল্লার ভাই কালাম মোল্লা ৫নং ওয়ার্ড শার্শি রুপাই এতিমখানা মাদ্রাসা কেন্দ্রে দুপুর পৌনে ২টায় ব্যালট পেপার নিয়ে পুলিশ ও প্রিজাইডিং অফিসারের উপস্থিতিতে নৌকা প্রতীকে সিল মারেন। রায়াপাশা-কড়াপুর ইউনিয়নের মঙ্গলহাটা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি’র কর্মী-সমর্থকদের সংঘর্ষের ঘটনায় বেশ কিছুক্ষণ ভোট গ্রহণ বন্ধ ছিলো। এছাড়া ওই ইউনিয়নের বারুখায়ের দিঘিরপাড় সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে এবং একই ইউনিয়নের কটুরাকাঠী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে দু’পক্ষের সংঘর্ষের কারণে সাময়িক ভোট গ্রহণ বন্ধ রাখা হয়।
উজিরপুর উপজেলার সাতলা, হারতা, জল্লা, ওটরা, বরাকোটা, শোলক ও বামরাইল ইউনিয়নের মধ্যে একমাত্র সাতলা ব্যতিত সবগুলো ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ দলীয় চেয়ারম্যান প্রার্থীর বাইরে বিদ্রোহী (স্বতন্ত্র) ও বিএনপি মনোনীত প্রার্থীর এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া হয়। ওই ৬টি ইউনিয়নের বিএনপি ও আওয়ামীলীগের বিদ্রোহী প্রার্থীরা ভোট বর্জন করেন।
হিজলার ৪টি এবং মেহেন্দিগঞ্জের ৮টি ইউনিয়নের সবগুলো কেন্দ্র থেকে বিএনপি’র এজেন্টদের বের করে দিয়ে নৌকার কর্মী-সমর্থকরা একতরফা জাল ভোট দিয়েছে বলে অভিযোগ এনে সেখানকার বিএনপি’র ১২ চেয়ারম্যান প্রার্থী ভোট বর্জন করেন।
এছাড়া গৌরনদী, আগৈলঝাড়া ও মুলাদীর ১৮টি ইউনিয়নের সবগুলো কেন্দ্র দখল করে বিএনপি’র এজেন্টদের বের করে দিয়ে আওয়ামীলীগের লোকজন জালভোটের মহোৎসব করেছে বলে অভিযোগ করেছেন জেলা (উত্তর) বিএনপি’র নেতৃবৃন্দ।
একইভাবে বাকেরগঞ্জ উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নের সবগুলো কেন্দ্র দখল করে ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে জাল ভোট দেয়ার অভিযোগ করেন বাকেরগঞ্জ উপজেলা বিএনপি’র নেতৃবৃন্দ।
সন্ধ্যায় নগরীর সদর রোডস্থ বিএনপি’র দলীয় কার্যালয়ে সাবাদিক সম্মেলন করে দক্ষিণ ও উত্তর জেলা বিএনপি’র পক্ষ থেকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে শাসক দল আওয়ামীলীগের মনোনীত প্রার্থীদের তান্ডব চিত্র তুলে ধরা হয়।
এদিকে ভোটের আগের রাতে নৌকার প্রার্থীর পক্ষে নগরী থেকে চরমোনাই আওয়ামীলীগ দলীয় ক্যাডাররা ভোট কেন্দ্র দখলের উদ্দেশ্যে অবস্থান নিলে তাদেরকে স্থানীয় জনগণ আটক করে গণধোলাই দেয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন নগরী থেকে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের ২৫/৩০ জন ভাড়া করা সন্ত্রাসী রাতের অন্ধকারে কীর্তনখোলা নদী পাড়ি দিয়ে ওই ইউনিয়নে অবস্থান গ্রহণ করে। স্থানীয় বাসিন্দারা টের পেয়ে তাদেরকে বিশ্বাসের হাট এলাকায় আটক করে বেদম মারধর করে নগরীতে ফেরত পাঠায়। পুলিশ ও সদর উপজেলা চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান রিন্টু এ ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেন। একই সাথে সেখানকার প্রতিদ্বন্দ্বী চেয়ারম্যান প্রার্থীরাও সন্ত্রাসীদের প্রতিহত করার বিষয়টি সঠিক বলে জানিয়েছেন।