বরিশালে নকল মাষ্টার কিং জাম্বু কয়েলে সয়লাব

মামুনুর রশীদ নোমানী ॥ অনুমোদন নেই। অথচ বরিশালের বাজার সয়লাব নকল ও ভেজাল মাষ্টার কিং জাম্বু ব্রান্ডের কয়েলে। বিএসটিআইয়ের লোগো ব্যবহার করে উৎপাদিত কয়েল বাজারজাত করা হচ্ছে। অথচ মাষ্টার কিং জাম্বু ব্রান্ডের অনুমতি নেই। নেই বিএসটি আই সহ প্রয়োজনীয় কোন কাগজপত্র। নকল এই কয়েল বাজারজাত করার ফলে তা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। মাষ্টার কিং জাম্বু কয়েলের প্যাকেটে প্রস্তুতকারক মাহিম কেমিক্যাল, ঢাকা উল্লেখ করা হলেও নেই ফ্যাক্টরী কিংবা তাদের অফিসের কোন নাম ঠিকানা। উল্লেখ নাই উৎপাদনের তারিখসহ রেজিঃ নম্বর। অনুসন্ধানে জানা গেছে, মশার হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্য কয়েল একটি পুরনো ও বহুল ব্যবহৃত প্রতিরোধক। আর সব মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে থাকায় কয়েলের প্রয়োজনীয়তা বেশী। তাই ব্যাপক বিক্রি হওয়ায় অসাধু লোকজন ভেজাল, নকল, অনুমোদন বিহীন ভাবে কোন পরীক্ষা নিরীক্ষা ছাড়াই কয়েল উৎপাদন করে বিক্রি করে। লাভবান হলেও যারা ব্যবহার করে তারা হয় ক্ষতির সম্মুখীন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাহিম কেমিক্যাল কোম্পানি ঢাকা কর্তৃক বানানো মাস্টার কিং জাম্বু ব্রান্ডের কোন প্রকার অনুমোদন নেই। এটি একটি ভুয়া কোম্পানি।

এ ব্যাপারে বিএসটিআইর সিএম ইউং থেকে জানানো হয়।
মশার কয়েল প্রস্তুতকারকের জন্য যা যা দরকার ঃ
১।    ট্রেড মার্ক রেজিষ্ট্রেশন।
২।    ট্রেড লাইসেন্স।
৩।    বিএসটি আইয়ের অনুমোদন।
৪।    গুণগত মানের ছাড়পত্র।
৫।    পরিবেশ ছাড়পত্র।
৬।    স্যানিটারী ছাড়পত্র।
৭।    ফায়ার সার্ভিসের অনুমোদন।
৮।    কৃষি সম্প্রসারণ, খামারবাড়ী, ঢাকার অনুমোদন।
৯।    ঢাকা মহাখালীর জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকে প্রযোজনীয় অনুমোদন ও ছাড়পত্র।
১০।    বাজারজাত করার অনুমোদন।
১১।    ভ্যাট ও আয়কর সনদ।
১২।    কোম্পানি হলে জয়েন্ট স্টক এক্সচেঞ্জ থেকে নিবন্ধিত হতে হবে।
১৩।    মশার কয়েল প্রস্তুতের তারিখ /পণ্য ব্যবহারের সর্বশেষ তারিখ উল্লেখ থাকতে হবে।
এগুলোর একটিও নেই মাহিম কেমিক্যাল কোং উৎপাদিত মাষ্টার কিং জাম্বু কয়েলে। ফলে এ কোম্পানিটি ভুয়া। এমনকি এই কোম্পানির কোন আবেদন পর্যন্ত নেই বিএসটিআইতে। এ ব্যাপারে বিএসটিআই ঢাকা মান ভবনের ডেপুটি ডাইরেক্টর প্রশাসন তাহের জামিল এ প্রতিনিধিকে বরেন, মাষ্টার কিং জাম্বু কয়েলের কোন অনুমোদন নেই। তিনি বলেন, ১৫৫টি আইটেম বিএসটিআইয়ের আওতায়। তার মধ্যে এ গ্রেডে ফুড ও এগ্রিকালচার এর ৬৪টি পণ্যের মধ্যে ৩৬ নম্বর হল মশার কয়েল। তিনি বলেন, মাহিম কেমিক্যাল, ঢাকা কর্তৃক প্রস্তুত মশার কয়েল মাষ্টার কিং জাম্বু ব্রান্ড বিএসটিআইয়ের অনুমোদন না থাকায় ওই কোম্পানি ভুয়া এবং তারা সাধারণ মানুষের সাথে প্রতারণা করছে। এ ব্যাপারে বরিশালের বিএসটিআইয়ের আঞ্চলিক পরিচালক আমিনুল হক জানান, মাষ্টার কয়েল বা মাষ্টার কিং জাম্বু কয়েলের অনুমোদন নেই বিএসটিআই থেকে। তিনি বলেন, এটি বিএসটিআইয়ের অনুমোদন ছাড়া কিভাবে বিক্রি হয়। মশার কয়েল উৎপাদন বাজারজাত করণ করতে হলে বিএসটিআইয়ের অনুমোদন নিতে হবে। তিনি এও বলেন, মাষ্টার কিং জাম্বু ব্রান্ডের কয়েলের কোন প্রকার অনুমোদন নেই। মাহিম কেমিক্যাল কোং ঢাকা নামে কোন কোম্পানি বিএসটিআইয়ের অনুমতি নেয়নি মশার কয়েল বাজারজাত করণ, বিতরণ, গুদামজাত করণের। গুণগত মানের ছাড়পত্রসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকায় ওই কোম্পানি এবং যারা এসব অবৈধ মশার কয়েল বিক্রি করছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
ভোক্তার প্রতিক্রিয়া ঃ মাষ্টার কিং জাম্বু কয়েল ব্যবহারকারী নগরীর গোলাম সরোয়ার বলেন, আমি মাষ্টার কিং জাম্বু কয়েলের একটি প্যাকেট ক্রয় করি ৫০ টাকা দিয়ে। বাসায় গিয়ে কয়েল জ্বালানোর পরে বাসা ধোয়াচ্ছন্ন হয়। শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হওয়ার উপক্রম, চোখ জ্বালায় ও পোড়ায় তাই কয়েলের প্যাকেটটি বাসার বাইরে ফেলে দেই।
বেশী বিক্রি হওয়ার কারণ ঃ দাম কম। তাই দোকানিরা বেশি অর্ডার দেয়। লাভ বেশি। দোকানিরা আসল ও ভুয়া চেনে না। অসচেতন হওয়ায় তারা বিক্রি করছে সহজ ভাবে। কিন্তু এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি।
নকল ও ভেজাল কয়েলে কি কি ক্ষতি হয় ঃ এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগণ বলেছেন অনুমোদন বিহিন মশার কয়েলে গুণগতমান না থাকায় স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। কয়েলে রাসায়নিক উপাদানের মাত্রা বেশি থাকলে সেই ধোয়া গর্ভবতী মহিলা ও শিশুর জন্য বেশি ক্ষতিকর। শ্বাস ও প্রশ্বাসের ক্ষতি করে। ফুসফুসের ক্ষতি করে। এলার্জি রোগে আক্রান্ত হতে পারে। হাচি, কাশি লেগে যেতে পারে। এছাড়া হার্ট রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে কারণ কয়েল উৎপাদিত হয় রাসায়নিক দ্রব্যাদি, এডিটি থেকে। কীটনাশক থাকার ফলে বদহজম সহ পেট রোগে আক্রান্ত হতে পারে।
 এ ব্যাপারে বিএসটিআই’র সিএম বিভাগ জানিয়েছে যারা বিএসটিআইয়ের অনুমোদিত তাদের কয়েল পরীক্ষা নিরীক্ষা করে বাজারজাত করার অনুমোদন দেয়া হয়। তাই অনুমোদিত কয়েলে ক্ষতি হয়না। মাষ্টার কিং জাম্বু কয়েলের প্যাকেটে উৎপাদনের তারিখ নেই। বিএসটিআইয়ের ভুয়া লোগো ব্যবহার করছে। এ ব্যাপারে বিএসটিআইয়ের বরিশালের ডেপুটি ডাইরেক্টর মোঃ নুরুল হক ও সহকারী পরিচালক আলাউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, মাহিম কেমিক্যাল কোং, ঢাকা কর্তৃক প্রস্তুত মাষ্টার কিং জাম্বু ব্রান্ডের কয়েলের কোন অনুমোদন নেই বিএসটিআই থেকে। আমরা খোঁজ খবর নিচ্ছি। এসব অবৈধ কয়েল অভিযান চালিয়ে বন্ধ করে দেয়া হবে। এদিকে বিএসটিআইতে অনুমতিবিহীন, ভুয়া ও নকল ভেজাল জনস্বাস্থ্যের হুমকি মাষ্টার কিং জাম্বু ব্রান্ডের ব্যাপারে অভিযোগ দেয়া হয়েছে।
ভুয়া নকল ও অনুমতি বিহীন ভেজাল কয়েল বাজারজাত করণ বন্ধের দাবি জানিয়েছে সচেতন মহল। এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতিদিন বরিশালে ৫০ হাজার টাকার মাষ্টার কিং জাম্বু কয়েল বিক্রি হয়। শতকরা ১৫ ভাগ ভ্যাট দেয়ার নিয়ম থাকলেও এই কোম্পানি কোন ভ্যাট দেয়না। ফলে সরকার হারাচ্ছে রাজস্ব। বিএসটিআইয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মাহিম কেমিক্যাল কোং ঢাকা এর কোন ঠিকানা না থাকায় যারা ডিলারের দায়িত্বে থেকে বিএসটি আইয়ের অনুমোদন বিহীন পণ্যটি বাজারজাত করছে তাদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে মূল হোতাদের সন্ধান পাওয়া যেতে পারে। মাষ্টার কিং জাম্বু কয়েলের প্যাকেটে কোম্পানির ঠিকানা না থাকায় তাদের বক্তব্য নেয়া যায়নি।