বরিশালে বেপরোয়া মাদক সিন্ডিকেট চক্র

একের পর এক অভিযানে বিভিন্ন মাদক দ্রব্যসহ বিক্রেতারা আটক হওয়ার পরেও থেমে নেই এখানকার মাদকের জমজমাট ব্যবসা। সর্বত্রই বিক্রি হচ্ছে মরন নেশা ইয়াবা, ফেন্সিডিল থেকে শুরু করে গাঁজা- হেরোইন পর্যন্ত। হাত বাড়ালেই এসব নেশা জাতীয় দ্রব্য পাচ্ছে তরুণ শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে বেকার যুবকরা। এমনকি চাকুরিজীবী থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিরাও জড়িয়ে পড়ছে নতুন নতুন ব্র্যান্ডের নেশায়। সম্প্রতি বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের হাতে সর্ববৃহৎ মাদকের চালান আটক, নগরীর এরিনা হোটেলের মদের বারে অভিযান চালিয়ে ৬৩ জনকে জেল-জরিমানা, কাভার্ডভ্যানে অভিনব কায়দায় নিয়ে আসা অভিযান চালিয়ে র‌্যাব-৮’র হাতে বিপুল পরিমান ফেন্সিডিল ও গাঁজা উদ্ধারে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
গত এক সপ্তাহে র‌্যাব-৮ গোপন সংবাদের ভিত্তিতে নগরীর সিএন্ডবি রোডে অভিযান চালিয়ে ২ হাজার ৩৬০ বোতল ফেন্সিডিল ও ২৫ কেজি গাঁজা সহ দুই ব্যক্তিকে ও পুলিশ সপ্তাহ উপলক্ষে বরিশাল মেট্রোপলিটন কাউনিয়া থানা পুলিশের বিশেষ অভিযানে ৫১৪ পিস ইয়াবা এবং ইয়াবা বিক্রির নগদ এক লাখ ছয় হাজার টাকা সহ দুইজনকে গ্রেফতার করে। এরআগে গত বছরের আগস্ট মাসে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশেল সর্ববৃহৎ মাদকের চালান আটক করে কোতয়ালী মডেল থানা পুলিশ। এ থানার অধিন নগর সংলগ্ন চরমোনাই ইউনিয়নের ডিঙ্গামানিক গ্রামে এবং নগরীর জর্ডন রোডের একটি ভাড়া বাসায় অভিযান চালিয়ে ২০ হাজার পিস ইয়াবা সহ দু’ জনকে গ্রেফতার করা হয়। এছাড়াও গত বছরের ১ এপ্রিল বরিশাল নদী বন্দর এলাকায় একটি যাত্রীবাহী লঞ্চের তৃতীয় তলার কেবিন থেকে ৯ হাজার ৮শ পিস ইয়াবা সহ দুইজনকে গ্রেফতার করে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ। ঐ সময়ে কোস্টগার্ড কুয়াকাটা সংলগ্ন সমুদ্রে পাঁচ লাখ পিস ইয়াবা সহ দু’ মাদক কারবারীকে গ্রেফতার করে।
র‌্যাব ও পুলিশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন ইয়াবা আসার পরে ফেন্সিডিলের কদর কমে যায় মাদক সেবিদের কাছে। এখন বিপুল পরিমান ইয়াবা নগরীতে বিক্রি হলেও তা ধরা মুশকিল হয়ে পড়ে। বিগত দিনে যারা ফেন্সিডিল বিক্রি করতো সেই সব চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ও তাদের দেয়া তথ্য মতো খুচরা ইয়াবা বিক্রেতাদের মাঝে মধ্যে গ্রেফতার করা হলেও নতুন করে ইয়াবা ব্যবসার সাথে যারা জড়িয়ে পড়েছেন তারা থেকে যাচ্ছেন ধরা ছোয়ার বাইরে। ফেন্সিডিলের চেয়ে ইয়াবা ট্যাবলেট বহন করা সহজ হওয়ার কারনে তা থেকে যাচ্ছে ধরা ছোয়ার বাইরে।
প্রতিদিনই র‌্যাব-৮, রেঞ্জ পুলিশ, বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের ৪ থানা, জেলা ও মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ, নৌ-পুলিশ, কোস্টগাড সহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিভাগ এসব মরণ নেশা সহ একাধিক ব্যক্তিকে আটক করছে। হাজার হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার হলেও থেমেই নেই ব্যবসা। অভিনব কৌশলে ইয়াবা ঢুকছে নগরীতে। তা খুচরা বিক্রেতারা বিক্রির সময় র‌্যাব-পুলিশ কৌশলে ২/১ জনকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হচ্ছে। বাকিরা ইয়াবা ও ফেন্সিডিল নিয়ে চষে বেড়াচ্ছে নগরী। গাঁজা ও হেরোইন বিক্রির জন্য রয়েছে খুচরা বিক্রেতা। ফলে নির্দিষ্ট কোনো মাদক জোনে হানা দিয়ে এখন আর আগের মতো মাদক দ্রব্য উদ্ধার করা আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষে সম্ভব হয় না। সর্বত্রই খুচরা বিক্রেতাদের অপতৎপরতা বেড়েছে। আবার যারা মাদক দ্রব্য সহ র‌্যাব-পুলিশের হাতে গ্রেফতার হচ্ছে তারাও কিছুদিনের মধ্যে জামিনে মুক্তি পেয়ে পুরনো পেশায় যুক্ত হচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাদক বহনে প্রতিনিয়ত নিত্যনতুন কৌশল অবলম্বন করছে ব্যবসায়ীরা। এম্ব্যুলেন্সে এমনকি লাশের কফিনও ব্যবহার করছে তারা। এছাড়া সবজির ট্রাক, মাছের ঝুড়ি, চিঠির খাম, জুতার তলায়, স্কুল ব্যাগে করেও মাদক পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন মাদকের স্পটে। সবচেয়ে নিরাপদ হচ্ছে কুরিয়ার সার্ভিস। তথ্য প্রযুক্তির উন্নয়নে স্বল্প সময়ের মধ্যেই মোবাইলের মাধ্যমে অর্থনৈতিক লেনদেন করে থাকে ফলে তাদের কাছে কুরিয়ার সার্ভিসই হচ্ছে সবচেয়ে সহজ মাধ্যম। নগরীতে বিক্রির জন্য প্রবেশদ্বার পর্যন্ত নানান পরিবহনে আসে মাদক দ্রব্য। নিরাপদ স্থানে তা নামিয়ে দ্রুতগতি সম্পন্ন আলফা মাহেন্দ্র যোগে খুব সহজেই নির্দিষ্ট গন্তব্যে নিয়ে মজুদ করা হয়। দ্রুতগামী আলফা মাহেন্দ্রকে আটক করতে ব্যর্থ হয় আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী। র‌্যাব-পুলিশের যানবাহনের চেয়ে ভারত থেকে আমদানী করা আলফা মাহেন্দ্র’র গতি অনেক বেশি। মাদক বহনের সময় এ যানবাহনটি বেপরোয়া গতিতে ছুটে চলে। তখন দুর্ঘটনায় পথচারীর প্রাণ হারালেও তারা সেদিকে ফিরে তাকান না। নিরাপদ স্থানে মজুদ করা ইয়াবা, ফেন্সিডিল সহ বিভিন্ন মাদক দ্রব্য খুচরা বিক্রেতাদের মাধ্যমে মোটর সাইকেল যোগে পৌঁছে দেয়া হয় সেবনকারীদের কাছে। আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে নগরীর অলি-গলিতে চলছে মাদকের রমরমা ব্যবসা। জোড়ালো অভিযানের সময় ২/১ জন আটক হলেও অধিকাংশরাই থেকে যায় ধরা-ছোয়ার বাইরে। খুচরা বিক্রেতাদের টপকিয়ে যেসব সেবনকারীরা মাদক সম্রাটদের আস্তানায় ছোটেন তাদের দেখা মিলে নগরীর পশ্চিম কাউনিয়া সাধুর বটতলা, কাউনিয়া বিসিক শিল্প এলাকা, ব্রাঞ্চরোড, শ্মশান ঘাট, মরকখোলার পোল, নতুনবাজার, ভাটিখানা, ফকিরবাড়ি, কালিবাড়ি, রাখালবাবুর পুকুরের পাড়, বালুরবস্তি, থানাকাউন্সিল, রূপাতলী বাস টার্মিনাল, নথুল্লাবাদ বাস টার্মিনাল, সিএন্ডবি সড়ক, কাশীপুর চৌমাথা, গড়িয়ার পাড়, কাশীপুর রেন্ট্রিতলা, বেলতলা খেয়াঘাট, চরকাউয়া ফেরিঘাট এলাকায়।