শহীদ আসাদ : গণআন্দোলনের মহানায়ক

অপূর্ব গৌতম
‘আসাদ গেট’ নামক একটি স্থানের সাথে হয়তো কারো কারো পরিচয় আছে। যারা ঢাকায় থাকেন বা ঢাকায় আসা যাওয়া করেন তাদের কাছে এটি একটি পরিচিত নাম। কে এই আসাদ, কেন তার নামে একটি গেট হলো এমন প্রশ্ন কয়জনের মনে উঁকি দেয় আমি ঠিক জানিনা। বোধকরি প্রগতিশীল রাজনীতির সাথে যুক্ত মানুষগুলো বাদে অন্যদের কাছে এটি শুধুই একটি গেটÑআসাদ গেট।

আসাদ উনসত্তুরের গণআন্দোলনের মহানায়ক। আইয়ুব খানের শাসন, শোষণ, নির্যাতন, নিপীড়নের বিরুদ্ধে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করা এবং তীব্র গণআন্দোলন তৈরি করে বাঙালিদের ন্যায্য দাবী আদায়ে সে ছিল অকুতোভয়। আন্দোলন দমাতে আইয়ুব খান ১৪৪ ধারা জারি করলে তাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখায় আমানুল্লাহ্ মোহাম্মদ আসাদুজ্জামা (আসাদ)। শরীরের সবটুকু শক্তি দিয়ে আইয়ুব বিরোধী শ্লোগান দেয়। ২০ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা থেকে মিছিল নিয়ে শহীদ মিনারের দিকে অগ্রসর হলে এক তাবেদার পুলিশ তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। আসাদ লুটিয়ে পরে রাজপথে। রক্তে ভিজে যায় শার্ট-প্যান্ট, রাজপথ। রক্তে ভিজে যায় সহযোদ্ধাদের হাত-পা, শার্ট-প্যান্ট। দ্রুত হাসপাতালে নেয়া হলে, ডাক্তার জানিয়ে দেয় মৃত্যুর খবর। ঝড়ের গতিতে ছড়িয়ে পরে আসাদের মৃত্যু খবর। দেশ হয়ে উঠে উত্তাল, সমস্ত মানুষ রাস্তায় নেমে আসে আইউব বিরোধী শ্লোগান নিয়ে। মুহূর্তেই পাল্টে যায় আন্দোলনের গতিপথ। কেন্দ্রিয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ২২, ২৩, ২৪ জানুয়ারি সারাদেশে ৩ দিনব্যাপী শোক পালন ও হরতাল কর্মসূচি ঘোষণা করে। কর্মসূচির শেষ দিনে হরতাল চলাকালে আন্দোলনকারীদের উপর পুলিশ গুলি চালায়। এতে ঢাকার পরিস্থিতি গভর্নর মোয়ানেম খানের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এই গণঅভ্যুত্থানেই আইয়ুব খানের পতন ঘটে। জয় হয় জনতার। এর পরই শহীদ আসাদ বাঙালিদের সংগ্রামের প্রতীক হয়ে ওঠেন। তার নামে করা হয় আসাদ গেট, আসাদ পার্ক, আসাদ এভিনিউ।
৬৯ এর বিজয়ের মধ্য দিয়েই বাঙালি জাতি স্বাধীনতার স্বপ্নবীজ বুনে। আকাঙ্খা রূপ নেয় তীব্র আকাঙ্খায়। শুরু হয় মুক্তির সংগ্রাম। আমরা যুদ্ধ করি এবং বিজয়ী হই। এবং আমরা ধীরে ধীরে ভুলতে বসি আমাদের গণআন্দোলনের মহানায়ক শহীদ আসাদকে। দিন যত যায় আসাদের অবদান তত ক্ষীণ হতে থাকে।
আসাদ ছিলেন বামপন্থী। শোষক-লুটেরাদের বিরুদ্ধে তার ছিল তীব্র হাঁক। জনগণতন্ত্র ছিল তার স্বপ্ন। এখনও বাংলাদেশের কিছু মানুষ স্বপ্ন দেখেন সমাজতন্ত্রের, বৈষম্যহীন একটি রাষ্ট্র ব্যবস্থার। ১৭ কোটি মানুষের বেশির ভাগই ভাববাদের আদর্শে দীক্ষিত। বৈষম্যের বেড়াজালে আমরা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছি। মুক্ত চিন্তা বা জনগণের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দেয়া এখন আর আগের মতো সহজ নয়। তারপরও এখনও কিছু মানুষ আসাদের রক্তঋণ শোধে উদ্যোগ নেয়, কর্মসূচি পালন করে, কবি শামসুর রাহমানের ‘আসাদের শার্ট’ কবিতাটি আওড়ায়। স্বপ্ন দেখে সা¤্রাজ্যবাদ, আধিপত্যবাদ, সম্প্রসারণবাদ মুক্তি স্বদেশ। যেখানে ধর্মের দোহাই দিয়ে দাঙ্গা বাঁধবে না, অর্থের অভাবে বিঘœ ঘটবে না লেখাপড়ায়, চিকিৎসার অভাবে মারা যাবে না দরিদ্র কৃষক। কপালে ছিল বলে, লুটপাট করবে না হাজার হাজার কোটি টাকা।
২০ জানুয়ারি আসাদ দিবস। আবার সময় এসেছে আরেকটি গণঅভ্যুত্থানের। যে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বিদায় করা হবে, শোষণ, নির্যাতন, নিপীড়ন, লুটপাট ও ধর্মব্যবসায়ীদের। এর মধ্য দিয়েই আমরা আসাদের রক্তঋণ শোধে মুষ্টিবদ্ধ হাত উর্দ্ধে তুলে রাখবো।