কষ্টভাষন

নির্বাক ।।
     সন্তান কখন বাবা মাকে দগ্ধ করে
বেশ কয়েক বছর আগের কথা। আমার ছেলে আমাকে ফোন করে বললো,বাবা কাউকে পাঠাও, ল্যাপটপ নষ্ট। গেমস খেলতে পারছি না। আমি বললাম, আচছা। পরে ভুলে গেলাম। বেশ ক’বার ফোন দেয়ার পর আমি লোক পাঠালাম। সে পরে এসে আমাকে যা বললো তাতে আমি হতবাক। ছেলে নাকি এমন সব গেমস খেলছে যা কোনোমতেই শিশুদের উপযোগী নয়। ভয়ংকর সব বড়দের গেমস। আর আপনারাতো জানেনই এখনকার গেমস মানেই শ্যুট করো,কিল করো,ডেষ্ট্রয় করো। কিছু গেমসে আবার থাকে যৌন সুড়সুড়ি। এসব গেমস শিশুদের মনোজগত ধ্বংস করে দেয়। কোমলমতি শিশুদের দয়া মায়াহীন পাষান  রোবটে পরিনত করে।  মেজাজ রাখে খিটখিটে। যাক তখন ছেলের বয়স আর কতো, পাঁচ কি ছয় বছর। রাতে বাসায় গিয়ে ছেলের মা’র সাথে কথা বললাম। ছেলেকে ধীরেসুস্থে দিনের পর দিন আমরা বুঝালাম। রাগারাগি করলাম না। এতে হিতে বিপরীত হতে পারে, ব্রেনে খারাপ ধরনের প্রতিক্রিয়া হতে পারে। এভাবে তিন মাস পার হবার পর ছেলে গেমসের আসক্তি থেকে মুক্ত হতে পেরেছে। এখন সে মাঝে মাঝে কেবল ডিসকভারি চ্যানেল দেখে। সেদিন গিয়েছিলাম এক অনুষ্ঠানে। দেখি ছোট ছোট বাচ্চাদের  হাতে স্মার্টফোন। তারা  নিজেরা নিজেরা নানা গেমস নিয়ে কথা বলছে। ঈদের দিন গিয়েছিলাম এক বন্ধুর বাসায়। সে বেশ গর্ব করে বলছিল জানো বন্ধু আমার ছোটটাতো এখন নিজে নিজেই মোবাইলে গেমস নামায়ে খেলে, যুদ্ধের গেমস ! নিজে নিজে ছবি তুলতে পারে। আজকাল বাবা মায়েদের দেখি , কথা বলতে না পারা বাচ্চাটা যখন স্মার্ট ফোনে নিজে নিজেই গেমস ওপেন করে, সেল্ফি তোলে, ইউটিউবে গান শোনে, তখন সেই কথা গর্ব ভরে জনে জনে বলে বেড়ান। কিন্তু বাবা মায়েরা এর কনসিকোয়েন্স চিন্তা করেন না। সময় কোথায় ! একটা সময় ছিল যখন নেট এভেইলেবল ছিল না।  সেই সময়ের শিশু কিশোরদের শৈশব কৈশোর ছিল নির্জলা নির্মল। তাদের জগৎ ছিল নিষ্পাপ নির্ভেজাল । তাদের চিন্তাধারা জুড়ে ছিল তাদের বাবা মা , ভাই বোন, খেলার সাথী বন্ধু বান্ধব। কখনও বা গল্পের বই ঠাকুমার ঝুলি কিংবা দাদু নানুর মুখে গল্প শোনা। আর এখন ক্লাস সিক্সে পড়ুয়া মেয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়, “আমি আমার অতীত ভুলে যেতে চাই। ” কেন দেয় জানেন ? আপনি যা পারেন না , সেটায় এখন সে পারদর্শী। স্মার্টফোনে আপনার আগোচরে আপনার সন্তান অনেক কিছু করে , আপনি সেটা বোঝেনও না, জানেনও না । বরং ভাবেন বাহ,ওরা কতো এডভান্স ! স্মার্টফোনে কিনা  পারে ! স্মার্ট ফোনে সব পারাটা কতটুকু নিরাপদ ভেবে দেখেছেন কখনও ? ইউটিউবে আপনার ছেলেটা কার্টুন দেখে , কিন্তু স্পনসরড ভিডিও কি ফিল্টার করা যায়? সেটা কি মূল ভিডিওর পাশে পপ আপ হয় না ? সেটায় যে এডাল্ট কমেন্ট নেই কিভাবে জানবেন ? সেখানে যে তার ক্লিক পড়ে না কিভাবে জানবেন ? বারাক ওবামা মেয়ে সাশাকে ফোন কিনে দিয়েছেন কলেজ লেভেলে ওঠার পর, তাদের কি টাকার অভাব ছিল ? নাকি নেট সিকিউরিটির অভাব ? সাশার ফোন কল মনিটর করা কি  দুরূহ ছিল ? জাপানি একটা জনসচেতনতামূলক ভিডিওতে দেখলাম বাবা মা তার বাচ্চা ছেলেকে নিয়ে এসেছেন স্মার্ট ফোনের দোকানে। ট্যাব দেখছেন , বাচ্চার মায়ের সাথে পরামর্শ করছেন, এটায় ভাল ভাল গেম প্রি ইনস্টলড আছে,এটাই ভাল হবে।
দাম জিজ্ঞেস করলেন কত? সেলসম্যান দাম বলল।  এরপর জিজ্ঞেস করলো কার জন্য নিবেন ?
– বাচ্চার জন্য ।
– ওর বয়স কত ?
– পাঁচ ।
– ধন্যবাদ স্যার , আপনার প্রোডাক্ট আপনার বাসায় পৌঁছে যাবে ঠিক সাত বছর পর ।
– কি বলছেন আপনি ?
– বার বছর বয়েসই ট্যাবলেট ইউজ শুরুর এপ্রোপ্রিয়েট সময়। এখন ওর বয়স তার বাবা মায়ের সাথে সুন্দর সময় কাটানোর , বাবা মায়ের স্নেহ ভালবাসাকে চেনার বয়স, before he becomes heartless।
আর এখন ফেইসবুকে  ছোট্ট ছোট্ট ছেলেমেয়েরা চ্যাটিং করে রিলেশন করে তাদের লাইফটাকে কতো জটিল করে ফেলেছে। আর স্ট্যাটাস দেয়,  ” আমি আমার অতীত ভুলে যেতে চাই “।
বেশ ক’দিন আগে আমার এক বন্ধু অাফসোস করে বলছিলো, আমার ছেলেটা ল্যাবেনটিস। পরীক্ষা শেষ হলেই  দিন রাত তিন গোয়েন্দা নিয়ে পড়ে থাকে। আমি বললাম  বন্ধু ওকে নিরুৎসাহিত কোরো না। আজকাল ছেলেমেয়েরা গল্পের বই পড়া ভুলেই গেছে। মা বাবাকে পোড়ানো ছেলেটার কাহিনী শুনে এখন বন্ধুকে বলতে ইচ্ছে হচ্ছে, তোমার ছেলে এই জেনারেশনের আর দশটা ছেলের মতো না , যারা স্মার্ট টেকনোলজির স্রোতে  ভাসছে। ভাসতে ভাসতে বাবা মাকে পুড়িয়ে মারছে। এই যুগে তিন গোয়েন্দার নিউজপ্রিন্টের পাতায় যে ছেলেটা রঙিন একটা সুস্থ জগতকে খুঁজে নিয়েছে সেই ছেলেটাকে আমি স্যালুট দেই।