খোদার ঘরে নালিশ করতে দিল না আমারে

লিটন বাশার ॥ জেলা প্রশাসকের কার্যালয় হইতে বাহির হইয়া আসিবার সময় প্রায়ই আইনজীবি সমিতির ভবনটি অতিক্রমকালে আমাদের প্রবীন সাংবাদিক এসএম ইকবাল ভাই’ কে মনে মনে খুজতে থাকি আর পুরনো দিনের একটা গান বে-সুর গলাই গুন গুন করে গাইতে থাকি। ‘ গান টি সকলেরই অতি পরিচিত এবং প্রিয় বটে ‘ খোদার ঘরে নালিশ করতে দিল না আমারে, পাপ পূন্যের বিচার এখন মানুষে করে।’ ইকবাল ভাই’র পরিচিতি সাংবাদিক নেতা হিসাবেই তবে তাহার পেশা বলিতে আইন ব্যবসা। যাহাকে আমরা সংক্ষেপে উকিল বলিয়া থাকি। মানুষের তৈরী করা আদালতে বিচার পাইতে হইলে ইকবাল ভাইদের মাধ্যমেই যাইতে হয়।
এই যে আমাদের জন্য নব গঠিত সম্প্রচার নীতিমালা তৈরী হইয়াছে। ইহার  বেড়াজালে কেহ আটকাইয়া পড়িলে রক্ষাকবজ হইবেন ইকবাল ভাই বা মানবেন্দ্র বটব্যাল অথবা নজরুল ইসলাম চুন্নু ভাই’র মত সাংবাদিক বান্ধব আইনজীবিরা। তাহারাই জানেন সম্প্রচার নীতিমালার নামে কোন আইনের মারম্যাচে আমাদের হাত শিকলবন্দী করা হইয়াছে। অবশ্য যেই সব আদালতে আমাদের বিচার করা হইবে সেই বিচারকরাও এখন আর স্বাধীন নহে। তাহাদের বিরুদ্ধেও আইন পাশ হইয়াছে। ৪০ বছর পর তাহাদের পাপ- পূন্যের বিচার করবেন জাতীয় সংসদের সদস্যরা। সাংবাদিক ও বিচারপতিদের জন্য নতুন দুইটি আইন কাছাকাছি সময়েই করা হইয়াছে। তবে বিচার বিভাগের সাথে সংশ্লিষ্টরা এক মঞ্চে উঠিয়া সরকারী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সোচ্চার হইলেও সাংবাদিকদের বেলায় সেটা দেখিলাম না।
এই নীতিমালা লইয়াও আমাদের সাংবাদিক নেতারা তাহাদের আর্দশের দুই নেত্রীর তল্পিবাহক হিসাবেই কথা বলিয়া যাইতেছেন। তাহাদের দ্বৈত নীতি আমাদের নতুন নীতিমালার জিঞ্জির পরাতে সরকারকে বেশ সহায়তা করিয়াছে বলিয়াই মনে হইলো।  গত কয়েক দিন যাবত একটা কথা মাথায় ঘুরপাক খাইতেছে। সরকার যেহেতু রাষ্ট্রের ৪টি গুরুত্বপূর্ন স্তম্ভের মধ্যে দুইটিকেই নিজের কব্জায় নিয়াছেন সেহেতু জনস্বার্থে লঞ্চওয়ালাদের জন্য নতুন কোন নীতিমালা করিলে দোষ কি? আমার কাছে লঞ্চকে অনেক গুরুত্বপূর্ন বলেই মনে হয়। আর ঈদ – কোরবানী এলে ঢাকা- বরিশাল রুটে যাতায়াতকারীদের সিংহভাগই আমার সাথে একমত হইবেন। তাহার কারন সম্প্রচার নীতিমালার অধীনে থাকা পত্র-পত্রিকা না পড়িলে বা টেলিভিশন না দেখিলে তেমন কোন ক্ষতি নাই। আমি এই পেশার সাথে সক্রিয় ভাবে যুক্ত থাকার পর জীবনের অনেক দিনই পত্রিকা পড়ি নাই। টিভিও দেখি নাই। তাহাতে আমার খুব বেশী ক্ষতি হইয়াছে বলিয়া মনে করিতেছি না। আর আদালত পাড়ায় আমার কোন যাতায়াত নাই বলিলেই চলে। আমি বিচার প্রার্থী বা বিচারের মুখোমুখি হওয়া ব্যক্তি নহে। আদালত পাড়ায় যাতায়াত নাই বলিয়া আমার খুব বেশী ক্ষতি হইতেছে মনে করিতেছি না। তবে ঈদ – কোরবানীর সময় একটি বিড়ম্বনা আমার জীবনকে বিষিয়ে তোলে। যেহেতু আমার পেশা সাংবাদিকতা সেহেতু সর্বমহলেই আমার একটা ঘনিষ্ট যোগাযোগ রহিয়াছে বলিয়াই সকলে ধরিয়া নেন। আবার ইহাও সত্যি যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যদি বরিশাল সফরে আসেন তাহার সংবাদ সংগ্রহ করিতে মানুষ আমাকে দেখিতে পান। প্রধানমন্ত্রীর সভাস্থলে আওয়ামী লীগের দুয়েক জন নেতাও হয়তো কানে ফিস ফিস করিয়া কথা  বলিতেছেন এমন দৃশ্যও মানুষ প্রত্যক্ষ করিয়া থাকেন।
আবার যদি হরিজন পট্টিতে আগুন লাগিয়া থাকে, দাঙ্গা হইয়া থাকে অথবা আরো বড় ধরনের কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটিয়া যায় তাহা হইলে সেইখানেও এই অধম সাংবাদিকদের দেখা মেলে। তাই আমাদের ঘনিষ্টজনরা ধরিয়া রাখেন তাহাদের বাথরুমে কোন সমস্যা দেখা দিলে আমি ও আমরা (সাংবাদিক) রক্ষা কবজ। কারন আমার সহিত হরিজন বাবুদের বেশ দহরম- মহরম। আবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে কোন ফাইল আটকাইয়া গেলে তাহাও আমার জন্য খুব সহজই মনে করিয়া থাকেন আমাদের ঘনিষ্টরা। আর লঞ্চের টিকেট একটা কেন ৫ টা যেন মুহুর্তের বিষয়। বাস্তবে লঞ্চওয়ালাদের সাথে আমাদের সামনা- সামনি সম্পর্কটাও মধুর । তবে পিছনে যে কোন লঞ্চ মালিকই সাংবাদিকদের দেখতে পারেন না তাহা বুঝি। সাংবাদিকদের ঠিক পুলিশের দৃষ্টিতে লঞ্চ মালিকরা দেখিয়া থাকেন বলিয়া আমার ধারনা। সামনা-সামনি একখানা সালাম দিলেও পিছনে ফিরে গালি দিতে ভূল করেন না। সামনা-সামনি থাকা লঞ্চ মালিকদের মুখের হাসিটাও দীর্ঘ হয় না যদি তাহাদের কাছে একখানা টিকেট পাইবার জন্য  আবদার করা হয়। মুখ গোমড়া করিবার দৃশ্য তবুও সামনা-সামনি দেখা যায় কিন্ত ফোনে তাহাদের চেহারাও দেখা যায় না। তবে তাহাদের কথা বার্তায় বোঝা যায় যে তাহারা কি বলিতে চাহিতেছেন। প্রথমত এই সময়টায় লঞ্চ মালিকদের খুজিয়া পাওয়া একটি দুরহ কাজ । ইহার পর অসংখ্য মোবাইল নম্বরের মধ্যে যদি কোন একটি নম্বর খোলা পাওয়া যায় তাহা হইলেও রিসিভ করিবার সম্ভবনা ক্ষিন। অপরিচিত নম্বর দেখে লঞ্চ মালিক যদি বিআইডব্লিউটিএ’র কোন কর্তা অথবা নৌ- পরিবহন মন্ত্রনালয়ের কোন চাকর বাকরদের নম্বর মনে করিয়া ভূল বশত ফোনটি রিসিভ করেন পরবর্তী ব্যবহারটুকু আপনাকে অপ্রস্তুত করিয়া দিতে বাধ্য। সাংবাদিক পরিচয় পাইবার পর যখন আপনি লঞ্চের টিকেটের জন্য কোন আর্জি করিবেন তখন তাহার অসংলগ্ন কথাবার্তা শুনিয়া মনে হইবে আপনি লঞ্চের ফ্রি টিকেট চাহিয়াছেন। অথবা ভিক্ষার জন্য তাহার কাছে হাত বাড়াইয়াছেন। লঞ্চ মালিক বিরক্তির সুরে নানান অজুহাত তুলিয়া আপনাকে হাইকোর্ট- জর্জকোট- সুপ্রীমকোর্ট সবই ঘুরাইয়া আনিবেন। আর চেস্টা করিবেন দ্রুত ফোন রাখিয়া দেওয়া যায় কি ভাবে। তাই ভাবিলাম যে অবুঝ প্রানী লঞ্চ মালিক মহোদয়দের জন্য কোন নীতি মালা করা যায় কি না। পরে ভাবিলাম না তাহাদের জন্য তো আইনের অভাব নাই। আকাশের তারা গুনিয়া শেষ করা যাইবে কিন্ত নৌ-যানের আইনের ধারা পাঠ করিয়া শেষ করা যাইবে না। তাহা হইলে কেন এই অসঙ্গতি ‘ হুজুরের গরু কেতাবে আছে, গোয়ালে নাই’ ! না এর চেয়ে সহজ উত্তর হচ্ছে  মানুষের তৈরী করা সকল আইন হচ্ছে মাকড়োসার জালের মত। এখানে গরিব মানুষ হালকা তাই আটকাইয়া যায়। আর ধর্নাঢ্য ভারী মানুষরা ছিড়ে চলে আসে। তাহাদের মাকড়োসার জাল আটকাইয়া রাখিতে পারে না। তাই আইন নতুন হউক আর পুরানো হউক সবই আমাদের মত নিরহ প্রানীদের জন্য। আইন ভারী কোন দুষ্ট প্রানীর জন্য নহে।
তাই সর্বদা বিনীত- নিবেদিত হইবার জন্যই প্রান্তকর চেস্টা চালাইয়া যাইতেছি। মাঝে মধ্যে নিজের সাথেও নিজে যুদ্ধ করিতে ভূল করি না। জাগ্রত স্বত্বা ও বিবেককে বলি চুপ থাকিতে। যখন সকল নীতি দূর্ণীতিতে আকন্ঠ নিমজ্জিত , যখন মানুষের বিবেক সুয়ে ঘুমায় তখন নতুন নীতি – সু – নীতি, সম্প্রচার নীতি আর কোন নীতি মানুষের শান্তি ফিরিয়া  দিবে তাহা বুঝি না। তবুও বিনয় এবং মিনতিকে সঙ্গী করিয়াই আমাদের আগামীর পথচলা।  তাই রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ভাষায় এই বিনয়- বিনম্র মিনতি—
আরো কতোটা নিবেদিতো হবো, কতোটা নিবেদিত হতে হয়
জন্ম শাসনের মতো কতটুকু শাসিত হবো,নতো হবো!
কতোটুকু নিয়ন্ত্রনে রেখে দিতে হয় উর্মিল অবাধ্যতা
অথবা কতোটা শব্দিত হতে হয়, শানিত হতে হয়!
কতোখানি ধ্বংশের হবো, কতোটুকু নির্মানের-
কতোটা প্রনত হলে শষ্যের ভারে নুয়ে পড়া দানের মতো
অঘ্রানে স্বর্নসম্ভবা হবো পয়মন্ত ফসল!
তবে কি ভরবে রাজার গোলা! যদি ভরে রাজার গোলা, পুরন হয় তার মন বাসনা তাইলে আমি আমরা তাই হবো। তাই হচ্ছি।