চিকিৎসকের বাসায় অমানুষিক নির্যাতনের শিকার শিশু গৃহকর্মী উজিরপুর হাসপাতাল থেকে উধাও ॥ থানায় ডায়েরী হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের

কাজে যোগদানের পর থেকেই ডা. সি.এইচ রবিনের স্ত্রী রাখির অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হয়ে শিশু গৃহকর্মীর ভাগ্যে ঘটতে থাকে অবর্ননীয় দুর্ভোগ। নির্যাতনে গুরুতর অবস্থায় তাকে গ্রামের বাড়ির সামনের রাস্তায় ফেলে রাখা এবং উজিরপুর থানা পুলিশের মাধ্যমে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসার এক পর্যায়ে ফের অর্থলোভীদের লোভের শিকার হতে হয়েছে ঐ শিশুটিকে। ২নং হারতা ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের মেম্বর নরেন্দ্রনাথ বাড়ৈ’র মধ্যস্থতায় চিকিৎসক দম্পত্তি বিষয়টি ধামাচাপা দেয়ার জন্য নানান লোভ দেখাচ্ছেন। ঐ লোভে পড়ে ২নং হারতা ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের মেম্বর নরেন্দ্রনাথ বাড়ৈ’র সহ শিশুটির স্বজনরা শিশুটিকে উধাও করেছেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানান, শিশুটির চাচা তপন বাড়ৈ ও চাচী মুক্তি বাড়ৈ অসুস্থ শিশুকে বার বার হাসপাতাল থেকে নিয়ে যাবার জন্য চিকিৎসকের কাছে ধর্না দেন। চিকিৎসা চলমান থাকায় চিকিৎসকরা শিশুটিকে হাসপাতাল ত্যাগে অনুমতি না দেয়ায় মেম্বর নরেন্দ্র নাথ বাড়ৈ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সাথে গভীর রাতে আলোচনায় বসেন। তাতে কাজ না হওয়ায় ভোর রাতের পর নিখোঁজ হয় শিশুটি। বুধবার রাতে রাস্তা থেকে তুলে এনে উজিরপুর থানা পুলিশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করলেও বৃহস্পতিবার গভীর রাত থেকে নিখোঁজ নিপা বাড়ৈ শুক্রবার রাত ৮টা পর্যন্ত কোথায় আছে তা জানাতে পারেননি থানা পুলিশ কিংবা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ মোঃ শওকত আলী সাংবাদিকদের জানান, শিশুটিকে ভর্তির পর থেকেই নানান মহল থেকে নিয়ে যাবার জন্য লোকজন আসে। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত তিনটার দিকে একজন ইউপি মেম্বরের নেতৃত্বে কিছু লোকজন শিশুটিকে নিয়ে যাবার জন্য আসলে তিনি পুলিশের অনুমতির কথা জানান। তিনি জানান, ভোররাত পাঁচটার পর থেকে শিশুটি নিখোঁজ হওয়ায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. সামসুদ্দোহা উজিরপুর মডেল থানায় সাধারন ডায়েরী করেন। উজিরপুর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জিয়াউল আহসান জানান, শিশুটির সংবাদ পেয়ে বুধবার রাতে উপজেলা কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। এরপর তার চাচা-চাচী দেখাশোনা করার জন্য ছিলো এবং এ ব্যাপারে আইনানুগ প্রক্রিয়া চলছিলো। তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিশুটি নিখোঁজ হওয়া নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন বিষয়টি উর্ধ্বতনদের অবহিত করা হয়েছে। তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী শিশুটিকে উদ্ধার করা এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা নেয়া হবে। বরিশাল জেলা পুলিশ সুপার মো. মারুফ হোসেন জানান, এ সংক্রান্তে সাধারন ডায়েরী হয়েছে তার তদন্তপূর্বক আইনানুগ ব্যবস্থা নিচ্ছে পুলিশ।
উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার প্রণতি বিশ^াস জানান, পুলিশ প্রশাসনের সাথে আলাপ করে শিশুটির জন্য যা যা করনীয় সে বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহায়তা করা হবে।
সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) বরিশাল জেলা সভাপতি প্রফেসর শাহ সাজেদা এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রশাসনের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে শিশুটিকে উদ্ধার করে তার সঠিক চিকিৎসা প্রদান সহ পরিবারের অপর সদস্যদের জন্য সহায়তার দাবী জানান। তিনি বলেন মমতাময়ী অনেকেই শিশুটির এ অবস্থার কথা শুনে সহযোগিতা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অথচ অসাধু লোকজন শিশুটিকে নিয়ে ফায়দা হাসিলের চেষ্টা চালাচ্ছে। শিশুটি তার উপর নির্যাতনের যে বর্ননা দিয়েছেন সে অনুযায়ী আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার দাবী জানান তিনি।
এদিকে স্থানীয় একাধিক সূত্রের মাধ্যমে জানা গেছে, ২নং হারতা ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের মেম্বর নরেন্দ্রনাথ বাড়ৈ নির্যাতিত শিশুটির পক্ষ হয়ে ডাক্তার দম্পতির কাছে দেন-দরবারের এক পর্যায়ে গভীর রাতে পাঁচ লাখ টাকায় দফারফা হয়। অভিভাবকহীন এ শিশুর পক্ষে এ টাকা খুব সহজেই ভাগাভাগি করা যাবে এমন আশায় শিশুটিকে কোথায় রাখা হয়েছে তা কেউই জানাতে পারেননি।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বাড়ৈ বাড়ির মানসিক ভারসাম্যহীন ননী বাড়ৈ’র স্ত্রী সিপু বাড়ৈ গত তিন বছর পূর্বে তিন শিশু সন্তান ফেলে অন্যত্র বিয়ে করে। মানসিক ভারসাম্যহীন ননী বাড়ৈ’র মৃত্যুশয্যায় থাকা পিতা উপেন বাড়ৈ (৭০) ও বৃদ্ধ মা সুর বাড়ৈ (৬০) সহ তিন সন্তানের জীবন-যাপন চলছে মানুষের দয়ার উপর ভিত্তি করে।
প্রসঙ্গত ঃ ডা. সি.এইচ রবিনের স্ত্রী রাখির অমানুষিক নির্যাতনের শিকার শিশু গৃহকর্মীকে সর্বশেষ ২৩ ফেব্রুয়ারী গ্রামের বাড়িতে ফেলে রাখা হয়। পরে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করলে দেখা যায় শরীরের বিভিন্ন স্থানে ক্ষত হয়ে রয়েছে। হাসপাতালের চিকৎসকরা তার পুরাতন ও নতুন ক্ষত এর চিকিৎসা দিচ্ছিলেন।