প্রাথমিক স্তরে পাঠদানে শিক্ষাপোকরণের প্রয়োজনীয়তা

 মোঃ আঃ কুদ্‌দূস, উপজেলা নির্বাহী অফিসার, বোরহানউদ্দিন, ভোলা।

শিশুকে শিক্ষা দান করা একটি মহৎ কাজ। এ মহৎ কাজটিকে ফলপ্রসূ করার জন্য উপকরণ ব্যবহার অপরিহার্য। যে সকল দ্রব্য ব্যবহারের ফলে শিক্ষাদান কার্যক্রম সহজ, সাবলীল, আকর্ষণীয়, আনন্দদায়ক, কার্যকর ও ফলপ্রসূ হয় তাকেই উপকরণ বলা যেতে পারে। শিক্ষার্থী কোন একটি বিষয়ে খুঁটিনাটি পরখ করে দেখতে পারলে শিশুর বিষয়টি সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা জন্মে এবং সে তা সহজেই অনুধাবন করতে পারে। এজন্য শ্রেণিকক্ষে পাঠদানকে শিক্ষার্থীর নিকট গ্রহণযোগ্য করতে হলে শিক্ষনীয় বিষয়কে নিকটতর করার জন্য উপকরণের ব্যবহার অনস্বীকার্য। শিক্ষার্থী কঠিন ও দূর্বোধ্য বিষয়সমূহ ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তুর সাহায্যে সহজে অনুধাবন করতে পারে, ফলে তা শিক্ষার্থীর মনে গভীরভাবে রেখাপাত করে। শিখন-শেখানো কার্যাবলিতে শত শত শব্দ বলে শিশুকে যা বুঝানো যায় না একটি শিক্ষা উপকরণ প্রদর্শণের মাধ্যমে অতি সহজে তা শিশুকে বুঝানো সম্ভব। একজন দক্ষ শিক্ষক পাঠ উপস্থাপনের সময় পাঠকে সহজ, আকর্ষণীয়, আনন্দদায়ক ও ফলপ্রসূ করার জন্য পাঠ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার করে থাকেন। পাঠে উপকরণ ব্যবহার করলে শিক্ষার্থীর শিখন স্থায়ী, প্রাণবন্ত এবং হ্রদয়গ্রাহী হয়। সেজন্য শিক্ষা উপকরণের মাধ্যমে জটিল বিষয়কে সহজে শিক্ষার্থীর নিকট স্পষ্ট ও বোধগম্য করানো যায়। শিক্ষাপোকরণ ব্যবহার করে পাঠদান করলে শিখনের বিষয়বস্তু শিশুর নিকট খুব সহজ মনে হয় এবং শিখন দীর্ঘস্থায়ী হয় ।

গবেষণায় দেখা গেছে, শিক্ষার্থীরা নিজে নিজে পড়ে শেখতে পারে মাত্র ১০%, শোনে শোনেশিখতে  পারে ২০%, দেখে দেখে শেখতে পারে ৩০%, শোনে এবং দেখে শেখতে পারে ৫০%, বলে ও লিখে ৭০%,শেখতে পারে  আর বলে এবং করে শেখতে পারে ৯০%। এছাড়াও অন্য একটি গবেষণায় দেখা গেছে। শ্রেণি কক্ষে শিক্ষক শিক্ষা উপোকরণ ব্যবহারের মাধ্যমে পাঠদান করেন, তবে শেখতে পারে  ৮৩% এবং শোনা বা আলোচনার মাধ্যমেশিক্ষার্থীর শেখতে মাত্র ১১%। এতে বুঝা যায়, শেখার জন্য শুনা একটি অত্যন্ত দুর্বল ব্যবস্থা এবং দেখে শেখা একটি কার্যকরি ব্যবস্থা।  তাহলে বুঝাগেল,উপকরণ ব্যতীত পাঠদান করলে তা শিক্ষার্থীর তেমন কোন উপকারে আসেনা। অবশ্যই শ্রেণিকক্ষে পাঠদান কালে উপকরণ ব্যবহার জরুরি।বিভিন্ন বিষয়ে পাঠদানের জন্য বাস্তব উপকরণ, যেমন-  ফুল, ফল, খেলার মাঠ, নদী যা সহজে পাওয়া যায়, অর্ধবাস্তব উপকরণ অর্থাৎ বিভিন্ন জিনিসের মডেল যেমন ঘরবাড়ি, শহীদ মিনার, জাতীয় স্মৃতিসৌধ, ফুল, ফল, পশুপাখি, মাছ  ইত্যাদির মডেলএবং চার্ট, বিভিন্ন বস্তুর  ছবি ইত্যাদি উপকরণ হিসাবে ব্যবহার করা যেতে পারে। একজন শিক্ষক ইচ্ছা করলে তার আশেপাশের পরিবেশ হতে নানাবিধ উপকরণ সংগ্রহ করতে পারেন। বিভিন্ন প্রকার ফেলে দেওয়া খেলনা, গাছ, পাতা, ফুল, কলম, কাগজের ঠোঙ্গা, অব্যবহৃত বোতল,  ফল, মার্বেল,বোতাম, বাঁশের কাঞ্চি, প্লাস্টিকের বিভিন্ন সামগ্রী, মাটির তৈরি জিনিসপত্র, চড়কা,  ঘুড়ি, বাঁশি ইত্যাদি সামগ্রী চারপাশের পরিবেশ হতে সংগ্রহ করা যায়। এছাড়াও তিনি সহকর্মীদের মাধ্যমে, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, URC, PTI, বিভিন্ন উপকরণ মেলা, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তির মাধ্যমে স্কুলের SMC এবং বিভিন্ন NGO এর মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকার উপকরণ সংগ্রহ করতে পারেন। এমনকিছু উপকরণ রয়েছে যেগুলো সংগ্রহ করা যায় না সে সব উপকরণ শিক্ষক নিজে তৈরি করে নিবেন।শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের সময় বিভিন্ন ধরনের উপকরণের প্রয়োজনীয়তা দেখা যায়। পাঠদানের বিষয়বস্তু বৈচিত্র্যময় হওয়ার কারণে উপকরণেরও বৈচিত্র্যময় হওয়া উচিত। উপকরণ অবশ্যই হাতের তৈরি বিনামূল্যের অথবা স্বল্প মূল্যের হতে হবে।একজন দক্ষ শিক্ষক ফেলে দেওয়া কাগজ, রঙ্নি কাগজ, পাটখড়ি, খেজুর পাতা, তুলা, দিয়াশলাইয়েরকাঠি, কটন বার, মালার পুতি,  পরিত্যক্ত কাগজ দিয়ে শিক্ষাপোকরণ তৈরি করতে পারেন। এছাড়াও ঢেঁড়স, কলার ডাটা, করলা, সুতা ও বিভিন্ন পাতাদিয়ে শিল্পকর্ম তৈরি করা যায়। কাদামাটি ও  ময়দাদিয়েও বিভিন্ন মডেল তৈরি করা যায়। শিক্ষক নিজে পাঠের সাথে মিল করে উপকরণ নির্বাচন করবেন। শিক্ষার্থীর বয়স, সামর্থ, মেধা ও গ্রহণ ক্ষমতা প্রভৃতিরপ্রতি খেয়াল করে উপকরণ তেরি করতে হবে। এছাড়াও শ্রেণিকক্ষের আকার ও শিক্ষার্থীর সংখ্যার প্রতিও খেয়াল রেখে উপকরণ নির্বাচন করবেন। অর্থাৎ উপকরণের আকার এমন হবে যেন পিছনে বসা শিক্ষার্থীও ভালভাবে তা দেখতে পায়। প্রদর্শনের সময়ে প্রথমে বাস্তব উপকরণ ও পরে অর্ধবাস্তব উপকরণ প্রদর্শণ করতে হবে।শিক্ষক বিষয়বস্তুর কোন বিষয়টির প্রতি লক্ষ রেখে শিক্ষাপোকরণ ব্যবহার করছেন তা পরিষ্কারভাবে শিক্ষার্থীর সামনে উপস্থাপন করবেন। এতেশিক্ষার্থীরা ঠিকমত শেখতে পারে। শিক্ষক যে উপকরণটি শ্রেণিকক্ষে ব্যবহার করবেন তার পূর্ণ ব্যবহার আগে থেকেই জেনে নিবেন যাতে দক্ষতার সাথে উহা প্রদর্শণ করতে পারেন। পাঠদানকালে উপকরণটি শিক্ষকের হাতের নাগালে রাখবেন যেন সময়মত তা প্রদর্শণ করা যায়। এছাড়াও শিক্ষক আরো কিছু বিষয়ে সজাগ দৃষ্টি রাখবেন যেমন – উপকরণটি শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যের সাথে সম্পৃক্ত কিনা, আকর্ষণীয় ও সঠিক কিনা, সহজলভ্য ও সহজে ব্যবহারযোগ্য কিনা, এবং শিক্ষাদান প্রক্রিয়াকে কার্যকর করতে সহায়তা করে কিনা তা পরখ করে নিবেন।  একইসাথে এমন অনেক উপকরণ ব্যবহার করা উচিত নয় যেগুলো শিশুর মনে দ্বিধা-দ্বন্ধের সৃস্টি করতে পারে।

উপকরণ শ্রেণিকক্ষে ব্যবহারের সময় সকল শিক্ষার্থীর দৃষ্টিগোচর করে তা প্রদর্শণ করতে হবে । যে উপকরণটি যতক্ষণ দেখানোর প্রয়োজন ঠিক ততক্ষণ উহা প্রদর্শণ করা প্রয়োজন। প্রদর্শণ শেষে উপকরণটি শিক্ষার্থীর দৃষ্টিসীমার বাইরে রাখতে হবে। কেননা উপকরণ প্রদর্শিত থাকলে শিক্ষার্থীর মনোযোগ উপকরণের দিকে থাকবে। এতেশিক্ষকের প্রতি তার মনোযোগ কমে যাবে। উপকরণ ব্যবহারের সময় প্রদর্শণ কাঠি ব্যবহার করতে হবে, হাত অথবা আঙ্গুল দিয়ে উপকরণ প্রদর্শণ করা ঠিক নয়। উপকরণ প্রদর্শণ পাঠের শুরুতে হওয়া বাঞ্চনীয়।বর্তমানে ডিজিটাল কন্টেন্ট এর মাধ্যমে ল্যাপটপে মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর ব্যবহার করে আরও আকর্ষণীয়ভাবে পাঠদান করা যায়। এক্ষেত্রে শিক্ষক আগে থেকেই ডিজিটাল কন্টেন্ট তৈরি করে রাখবেন। শিক্ষককে এক্ষেত্রে পারদর্শী হতে হবে। ইন্টারনেটের মাধ্যমে তিনি পাঠ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ছবি এবং ভিডিও প্রদর্শণ করতে পারেন। ফলে শিক্ষার্থীর নিকট পাঠদানটি আরো জীবন্ত ওহৃদয়গ্রাহী হয়ে ওঠবে।উপকরণ ব্যবহার শেষে শ্রেণিকরণ করে পরবর্তী ব্যবহারের জন্যে সুন্দরভাবেগুঁছিয়ে রাখতে হবে। মাঝে মাঝে উপকরণ শুকানোর জন্য রোদে দিতে হবে। শ্রেণিভিত্তিক এবং বিষয়ভিত্তিক উপকরণ সাজিয়ে রাখতে হবে। উপকরণ সংরক্ষণের জন্য আলমারি সবচেয়ে ভাল জায়গা । আলমিরা না থাকলে এমন জায়গায় রাখতে হবে যেন বৃষ্টির পানিতে এগুলো ভিজে না যায় অথবা ইঁদুর, উইপোকা ইত্যাদিতে ক্ষতি না করে সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। সাধারণত শুষ্ক স্থানে উপকরণ সংরক্ষণ উচিত। বিদ্যালয়ে সম্ভব হলে উপকরণ কর্ণারের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। মাঝে মাঝে কীটনাশক বা ন্যাপথালিন দিয়ে উপকরণ সংরক্ষণ করা যায়।

পরিশেষে, শিক্ষক আন্তরিকতার সাথে পাঠপরিকল্পনা প্রনয়ণপূর্বক  পাঠ সংশ্লিষ্ট আকর্ষণীয় উপকরণ ব্যবহার করে পাঠদান করতে সহজেই পারলে শিক্ষার্থীর শিখনফল অর্জিত হবে। এক্ষেত্রে প্রয়োজনে শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তাছাড়া প্রতি উপজেলায় উপকরণ মেলার আয়োজন করে পারদর্শী শিক্ষকদের পুরস্কারের ব্যবস্থা গ্রহণ করলে এ বিষয়ে শিক্ষকদের মাঝে প্রতিযোগিতা তৈরি হবে।