বরগুনাগামী লঞ্চে অগ্নিকান্ডে নদীতে লাফিয়ে পড়াদের উদ্ধারে অভিযান শুরু ॥ তদন্তে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি গঠন ॥ তিন দিনের মধ্যে রিপোর্ট জমার নির্দেশ

ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে বরগুনাগামী অভিযান ১০ লঞ্চে অগ্নিকান্ড থেকে বাচতে নদীতে লাফিয়ে পড়াদের উদ্ধারে অভিযান শুরু করেছে কোস্টগার্ড, ফায়ার সার্ভিস ও নৌ পুলিশের ডুবুরি দল। শুক্রবার বেলা ১১টা থেকে তিন বাহিনীর তিন দল উদ্ধার অভিযান শুরু করেছে বলে জানান ঝালকাঠির সহকারী পুলিশ সুপার মাহবুব হোসেন। তিনি জানান, ভোর ৫টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। যাত্রীদের উদ্ধারে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা কাজ করছেন। এদিকে এ ঘটনায় তদন্তে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় ৭ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে রিপোর্ট জমা দিতে বলা হয়েছে। ডুবুরি দল ৯ জনের মরদেহ উদ্ধার করেছে। তারা সবাই লঞ্চের আগুন থেকে বাঁচতে নদীতে ঝাঁপ দেন। উদ্ধার অভিযান চলছে। তবে অগ্নিকান্ডের ঘটনায় শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত ৩৮ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
এদিকে সকাল থেকে নদী তীরের গাবখান ধানসিঁড়ি এলাকায় দগ্ধদের স্বজনরা ভিড় করেন। স্বজনদের আহাজারিতে আকাশ বাতাস ভারি হয়ে উঠেছে ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীর তীর। এছাড়া আগুনের ঘটনায় দগ্ধ ৮০ থেকে ৯০ জন বরিশাল, ঝালকাঠিসহ আশপাশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তবে, বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিট বন্ধ থাকায় সেখানে দগ্ধ রোগীরা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. সাইফুল ইসলাম জানান, চিকিৎসকের অভাবে হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগটি বন্ধ রয়েছে। এ পর্যন্ত হাসপাতালে ৭২ জনকে ভর্তি করা হয়েছে। এর মধ্যে ৭ জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইন্সটিটিউটে পাঠানো হয়েছে।
জানা যায়, ঢাকা থেকে ৩১০ জন যাত্রী নিয়ে বরগুনা যাচ্ছিল অভিযান ১০ নামের লঞ্চটি। লঞ্চটি ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীর দপদপিয়া এলাকায় আসলে গতরাত ৩টার দিকে ইঞ্জিন কক্ষ থেকে আগুন লাগে। পরে লঞ্চটি ঝালকাঠির সদর উপজেলার দিয়াকুল এলাকায় গিয়ে নদীর তীরে নোঙর করে। খবর পেয়ে ঝালকাঠির ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে দুই ঘন্টা চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। পরে দগ্ধ যাত্রীদের উদ্ধার করে ঝালকাঠি ও বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। ঘটনাস্থলে বিভাগীয় প্রশাসন, জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের কর্মকর্তারা উপস্থিত হয়ে উদ্ধার কাজে সহযোগিতা করছেন।

বরিশাল শেবাচিম হাসপাতালে অগ্নিদগ্ধ যাত্রীদের দেখতে
আসেন নৌ পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহামুদ চৌধুরী
নৌ পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহামুদ চৌধুরী বলেছেন, লঞ্চে আমাদের হিসেব মতে ৩৫০ এর মত যাত্রী ছিলো। তবে এর বেশি থাকলে তদন্ত করে দেখা হবে। তাছাড়া লঞ্চের ফিটনেস ঠিক আছে বলে জানতে পেরেছি। মন্ত্রণালয় থেকে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। শুক্রবার দুপুরে অভিযান ১০ লঞ্চে অগ্নিকান্ডের ঘটনায় অগ্নিদগ্ধ যাত্রীদের বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ (শেবাচিম) হাসপাতালে দেখতে এসে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এই কথা বলেন তিনি। এসময় তিনি আরও বলেন, এখানে কোনো রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র রয়েছে কিনা সেটা এখনি বলতে পারছি না। লঞ্চের ব্যবসা কারা করে আপনারা সবাই জানেন, শেখ হাসিনার পরিবার লঞ্চের ব্যবসা করে না। আমরা দুর্ঘটনায় নিহত সকলের পরিবারকে দেড় লক্ষ টাকা করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছি। পরিদর্শনকালে প্রতিমন্ত্রীর সাথে বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি একেএম জাহাঙ্গীর হোসেন, জেলা আওয়ামী লীগের সধারণ সম্পাদক তালুকদার মোহাম্মদ ইউনুস সহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

শেবাচিম হাসপাতাল জুড়ে অগ্নিদগ্ধদের অর্তনাদ, চিকিৎসক নার্সদের
ছুটি বাতিল ॥ ঢাকা নেয়ার পথে শিশুর মৃত্যু
অগ্নিদগ্ধের ব্যাথায় ছটফট করছে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ (শেবাচিম) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ৭২ রোগী। হাসপাতালের পুরুষ, মহিলা ও শিশু সার্জারী ওয়ার্ডের সর্বত্রই দগ্ধের যন্ত্রনায় আর্তনাদ করছে তারা। এদিকে শেবাচিম হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগ বন্ধ থাকার ফলে চরম দুর্ভোগে পড়ছেন ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে অভিযান ১০ নামক লঞ্চে দুর্ঘটনায় অগ্নিদগ্ধ ৭২ রোগী। বার্ন ইউনিট বন্ধ থাকায় রোগীরা চিকিৎসা নিচ্ছেন সার্জারি বিভাগে। চিকিৎসকদের মতে বেশির ভাগ রোগীই ৫০ ভাগ দগ্ধ হয়েছে। এখন পর্যন্ত প্রায় ৭০ ভাগ দগ্ধ তিন শিশুসহ ৭ জনকে ঢাকা বার্ন হাসপাতালে রেফার্ড করা হয়েছে। বেশ কয়েকজন রোগীর জরুরী ভিত্তিতে রক্তের প্রয়োজন রয়েছে বলে চিকিৎসকরা মনে করছেন। ভোর ৫টা থেকে বরিশাল শেবাচিম হাসপাতালে ঢাকা থেকে বরগুনাগামী অভিযান ১০ নামক লঞ্চে আগুনে দগ্ধ রোগীরা আসতে শুরু করে। সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত ৭২ জন রোগী এই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে পুরুষ সার্জারী ওয়ার্ডের ৩ ও ৪ নম্বর ইউনিটে ৪০ জন, মহিলা সার্জারী ওয়ার্ডে ২০ জন, শিশু সার্জারী ওয়ার্ডে ৭ জন এবং অর্থপেডিক্স ওয়ার্ডে ৫ জন ভর্তি হয়েছেন। হাসপাতালের ওয়ার্ড মাস্টার আবুল কালাম আজাদ জানান, বর্তমানে শেবাচিম হাসপাতালে ৭২ রোগী ভর্তি আছেন। তাদের মধ্যে ৫০ রোগীর অবস্থা গুরুত্বর। তবে এখন পর্যন্ত কেউ মারা যান নি। সার্জারী বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. ফেরদাউস আহম্মেদ ও শিশু সার্জারী বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. তৈহিদুল ইসলাম চিকিৎসারতদের পর্যবেক্ষণ শেষে ৩ শিশুসহ ৫ জনকে ঢাকা বার্ন হাসপাতালে উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রেরণ করেছেন। হাসপাতালের পরিচালক ডা. এইচ এম সাইফুল ইসলাম জানান, জরুরী বিভাগে সকল রোগীকে ফ্রি টিকেটে ভর্তি করা হয়েছে। তাদের জন্য পর্যপ্ত ঔষধ, স্যালাইন, অক্সিজেন, বালিশ, বিছানা, কম্বল সরবরাহ করা হয়েছে। এছাড়া ব্লাড ডোনেশন ক্লাব গুলোকে রক্ত সরবরাহের জন্য বলা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, চিকিৎসক না থাকায় দীর্ঘ দিন আমাদের বার্ন ইউনিট বন্ধ রয়েছে। তবে সার্জারী ওয়ার্ডে দগ্ধ রোগীদের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। এছাড়া হাসপাতালের সকল চিকিৎসক ও নার্স এবং স্টাফদের সাপ্তাহিক ছুটি বাতিলের ঘোষণা দেয়া হয়েছে।
এদিকে ঢাকায় নেওয়ার পথে অগ্নিদগ্ধ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। শেবাচিম হাসপাতাল থেকে ঢাকা নেওয়ার পথে ১০ বছর বয়সী তাইফার মৃত্যু হয় বলে জানান তাইফার মামা বনি আমিন। তিনি বলেন, আমার বাবা তাইফার নানা আলী সিকদার বরগুনার কেওড়াবুনিয়া থেকে ঢাকায় গিয়েছিলেন চিকিৎসার জন্য। সাথে তাইফার বাবা বশিরও সাথে ছিলেন। ফেরার পথে দুর্ঘটনায় আমার বাবা নদীতে ঝাপ দিয়ে প্রান বাচায়। আমার বাবা, দুলাভাই ও ভাগ্নি সকলেই শেবাচিম হাসপাতালে ভর্তি ছিলো। তবে অবস্থা খারাপ হওয়ায় ভাগ্নিকে নিয়ে সাড়ে ১০টার দিকে হাসপাতাল থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই, ১১টার দিকে নগরীর আমতলার মোড়ে এ্যাম্বুলেন্সেই মারা যায় তাইফা।