বরিশালে মা ইলিশ রক্ষায় ৬৩৭ অভিযান, সাড়ে ৩ মেট্রিকটন মা ইলিশ উদ্ধার ॥ অতি লোভে পড়ে জেলেরা মা ইলিশ নিধন করছে

রাসেল সিকদার ও সিহাব ত্বোহা ॥
মা ইলিশ রক্ষায় দিন-রাত সমান তালে অভিযান পরিচালিত করে জেলে, জাল ও নৌকা আটক ও জেল-জরিমানায়ও থামানো যাচ্ছে না জেলেদের। মা ইলিশ রক্ষায় এত আয়োজন থাকলেও জেলেদের অতি লোভের কাছে হার মানতে হচ্ছে সকলকে। গত ৭ দিন এখানকার বিভিন্ন নদীতে টানা অভিযান পরিচালনাকারী নৌ থানা পুুলিশের সেকেন্ড অফিসার সফিকুল ইসলাম জানান, কেবল লোভ সামলাতে না পেরে জেলেরা জেনে শুনেই মা ইলিশ নিধন করছে। তিনি জানান, আশি^নের ভরা পূর্ণিমায় রাতভর মা ইলিশ রক্ষায় নদীর মোহনায় অভিযান চালিয়ে জেলে, জাল ও নৌকা আটক করা হচ্ছে। মুলত আশি^নের পূর্ণিমার রাতে মা ইলিশ ডিম ছাড়ে বেশি। এসময় ভাষানচর, বাগরজা, লেঙ্গুটিয়া পয়েন্ট, দড়ির চর, খাজুরিয়া, মাসকাটা নদী, তেতুলিয়া, মেঘনা, কীর্তনখোলার বেলতলা, চরবাড়িয়া, চরমোনাই পয়েন্ট, দপদপিয়া কালিজিরা পয়েন্টে জাল ফেললেই প্রচুর মা ইলিশ ধরা পড়ে। সফিক বলেন তিনি প্রায় অভিযানে দেখেছেন সামান্য জালে বেশ কিছু পয়েন্ট প্রচুর মা ইলিশ ধরা পড়ে।
বিগত বছরগুলোর তুলনায় চলতি বছর মা ইলিশ রক্ষায় বেশি অভিযান পরিচালিত হলেও জেলেদের হাত থেকে মা ইলিশ রক্ষা করতে হিমশিম খাচ্ছে সকলেই। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিগত বছরগুলোর তুলনায় অভিযান, জেলে আটক, জরিমানা ও জাল উদ্ধার বাড়লেও মা ইলিশ নিধন হচ্ছেই। অভিযান পরিচালনাকারীরা জানান, তারা ট্রলার নিয়ে পৌছানোর পূর্বেই জেলেরা নৌকা ফেলে রেখে তীরে চলে যায়। আবার চলে আসলে পুনরায় মা ইলিশ নিধন শুরু হয়। নদীর তীরবর্তী এলাকাগুলোতে বসবাসরত জেলেরা শাস্তির বিধান জেনেও ইলিশ ধরতে নামে। তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন পাড়া মহল্লার আনাচে-কানাচে এসব মা ইলিশ সামান্য দামে বিক্রি হয়।
অভিযান পরিচালনাকারী আইন-শৃংখলা ও মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তাদের সাথে আলাপাকালে জানা যায়, জেলেরা মা ইলিশ বিক্রি করতে পারবে না যেনেও কেবল অতি লোভেই মাছ শিকারে নেমে থাকে। কেননা ২২ অক্টোবর পর্যন্ত মা ইলিশসহ সব ধরনের ইলিশ ধরা, পরিবহন, মজুদ, বাজারজাতকরণ ও বিক্রি নিষিদ্ধ রয়েছে। আদেশ অমান্য করে ইলিশ মাছ আহরণ ও বিক্রি করলে এক বছর থেকে সর্বোচ্চ দুই বছরের সশ্রম কারান্ড বা পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হলেও জেলেদের দমিয়ে রাখা যাচ্ছে না। গত ৭ দিন মৎস্য দফতর, নৌ-বাহিনী, কোস্টগার্ড, নৌ-পুলিশ, থানা পুলিশ, এপিবিএনসহ অসংখ্য টিম সার্বক্ষণিক নজরদারী করলেও মা ইলিশ নিধন করার সময় হাতে নাতেই আটক হয়েছে ১৯৭ জন জেলে। এদের কাছ থেকে ৩ দশমিক ২৯ মেট্রিকটন মা ইলিশ উদ্ধার করা হয়েছে। গতকাল বিভাগীয় মৎস্য অফিসের সহকারী পরিচালক আজিজুল হক জানান, ৭দিনে মোট ৬৩৭টি অভিযানে আটককৃতদের বিরুদ্ধে ১৭৪টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। ৩১৫টি ভ্রাম্যমান আদালত বিভিন্ন মেয়াদে আটককৃতদের জেল দিয়েছেন এবং ৪ লাখ ২ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করেছেন।
নৌ-পুলিশের এখানকার ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার মোতালেব হোসেন জানান, মা ইলিশ রক্ষায় নৌ পুলিশ কঠোরতার সাথে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। যার ফল স্বরূপ গত ৭ দিনে ৯০ জন জেলেকে আটক, ৭ লাখ ২৩ হাজার মিটার জাল, ৫০৭ কেজি মাছ উদ্ধার করা হয়েছে। তিনি বলেন আধুনিক নৌযান, আধুনিক টহলযান, স্পিডবোট, দ্রুতগতির ইঞ্জিনবোর্ড যুক্ত করা হলে অভিযানগুলোতে সফলতা আরো বেড়ে যেত।
মৎস্য অধিদপ্তরের মৎস্য কর্মকর্তা (ইলিশ) বিমল চন্দ্র দাস জানান আশি^নের এই পূর্ণিমার রাতকে অনেকেই বলেন ইলিশের বাসর রাত। আড়িয়াল খাঁ, কীর্তনখোল, কালাবদরের মোহনার জুনাহার পয়েন্টে অভিযান চালিয়ে মা ইলিশ রক্ষায় সফলতা আসছে। তিনি জানান, ইলিশের এ প্রজনন মৌসুমে মিঠার পানির এখানকার নদীতে মা ইলিশ ডিম ছাড়তে চলে আসে। বিগত বছরগুলোর তুলনায় ইলিশ রক্ষায় অভিযান পরিচালিত হওয়ায় ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। সকলের প্রচেষ্টায় আগামী দিনগুলোতে সঠিক ভাবে অভিযান পরিচালিত হলে আগামীতেও প্রচুর ইলিশ মিলবে এখানকার নদীতে।
জেলা প্রশাসন, নৌ-পুলিশ, মৎস্য বিভাগের অভিযানে সফলতা আসলেও এবার কোস্টগার্ডের অভিযানে বিগত ৭দিনের পরিসংখ্যানে আটক মাত্র দু’ জেলে। গতকাল রবিবার তাদের আটক করা হয় বলে কোস্টগার্ড সূত্র জানায়। এছাড়া প্রায় ৭০ হাজার মিটার জাল আটক হয়েছে বলে জানা গেছে। নৌ-পুলিশের চেয়ে কোস্টগার্ডের আধুনিক নৌযান ও অন্যান্য সুবিধাদী থাকায় প্রতি বছর জেলে, জাল ও মা ইলিশ উদ্ধারে তারা এগিয়ে থাকে। কিন্তু এবার কোস্টগার্ডের ৭ দিনের চিত্র অত্যান্ত নাজুক বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে কোস্টগার্ডের এখানকার কন্ডিজেন্ট কমান্ডার মোশারেফ হোসেনকে ফোন করা হলে তিনি অভিযানে স্পীডবোর্ড চালাচ্ছেন বলে কোস্টগার্ড সদস্য জানান।
জেলা প্রশাসক মোঃ হাবিবুর রহমান জানান, মা ইলিশ রক্ষায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে উপজেলা নির্বাহী অফিসার, সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট’র নেতৃত্বে যৌথ টিম কাজ করে যাচ্ছে। এ যৌথ টিম মনিটরিংয়ের পাশাপাশি কোনো জেলে আইন অমান্য করলে তাৎক্ষনিক বিচারের আওতায় নিয়ে আসছে। এ যৌথ টিমে নৌ পুলিশ, মৎস্য বিভাগ কাজ করছে। জেলা প্রশাসক জানান নিষেধাজ্ঞার বাকি দিনগুলোতে নদীতে এ অভিযান অব্যাহত থাকবে। কেননা মা ইলিশ রক্ষা না পেলে ইলিশ উৎপাদন হুমকির মুখে পড়বে।
এদিকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এবারই প্রথম জেলা প্রশাসক হাবিবুর রহমানের উদ্যোগে মিডিয়া সেল গঠন করা হয়েছে। এ মিডিয়া সেলের মাধ্যমে তাৎক্ষনিক অভিযান সম্পর্কিত সংবাদ মেসেজ আকারে অথবা ই-মেইলে সরবরাহ করা হচ্ছে।