বুধবার আঘাত হানছে ‘মহাসেন’ ঝুঁকিপূর্ন অবস্থায় উপকূলের আবাসন প্রকল্পের পরিবারগুলো

শাহীন হাফিজ ॥ এম সুজন আকন ॥ বুধবার দুপুরের পরই উপকূলে আঘাত হানছে মহাসেন। এসময় এর গতিবেগ ঘণ্টায় ১১৫ থেকে ১৩৪ কিমিতে উঠানামা করবে। সঙ্গে প্রচুর বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। এমনটাই জানিয়েছে আবহাওয়া দপ্তর। আবহাওয়াবিদদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বৃষ্টিপাতের কারণেই মহাসেন দুর্বল হয়ে পড়বে। সন্ধ্যা ও রাতে ঝড়ের গতিবেগ কমে ৫৬ থেকে ৯৮ কিলোমিটার পর্যন্ত উঠানামা করবে। বৃহস্পতিবারও প্রচুর বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। সকাল থেকেই শুরু হবে। তবে এদিন ঝড়ের  গতি ৫৬ থেকে ৯৮ কিমি পর্যন্ত উঠানামা করবে। তবে সন্ধ্যা ও রাতে কমে যাবে।

এ অবস্থার প্রেক্ষিতে বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী এই বরগুনা জেলার আশ্রায়ন আবাসন প্রকল্পের অবস্থা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। উপকূলের মানুষ প্রতিনিয়ত প্রাকৃতিক দুর্যোগ (বিশেষ করে বন্যা) মোকাবেলা করে বেঁচে আছে। বন্যা পরবর্তী সময় এই এলাকার হাজার হাজার মানুষ গৃহহীন হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করে খোলা আকাশের নীচে। প্রকৃতির সাথে অঘোষিত লড়াই করে বেঁচে আছে এই বরগুনার মানুষ।

গত ২০০৭ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘুর্ণীঝড় সিডর ও ২০০৯ এর আইলা সহ পরবর্তীতে নদী ভাঙ্গনে গৃহহীন হয়ে পড়েছে এখানকার প্রায় দেড় লাখ পরিবার। জেলায় গৃহহীন এসব পরিবারের জন্য সরকারী ও বিভিন্ন দাতা সংস্থার সহায়তায় ২৮ টি আবাসন ১৮২ টি ব্যারাক হাউজ নির্মান করা হয়েছে। এতে পুনর্বাসন করা হয়েছে ৪ হাজার ৩৩৭ টি গৃহহীন পরিবারকে। কিন্তু  এই আবাসন ও ব্যারাক হাউজ গুলোর বেশির ভাগই নির্মান করা হয়েছে বেড়ী বাঁধের বাইরে নদীর পাড়ে চর ভরাট করে সম্পূর্ন  ঝুঁকিপূর্ন এলাকায়। ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বন্যা জলোচ্ছাসে ক্ষতিগ্রস্থ নিঃস্ব অসহায় পরিবার গুলোকে আবাসনের নামে ঠেলে দেওয়া হয়েছে এক মরন ফাঁদে। বিভিন্ন সময়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে এই আবাসনে বসবাসকারী অসহায় পরিবার গুলো। বন্যা বা জলোচ্ছাস দুরের কথা সামান্য জোয়ারের পানিতে অধিকাংশ আবাসন ও ব্যারাক হাউজ প্লাবিত হওয়ায় বসবাসরত মানুষের দুর্ভোগ নিত্য দিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে বরগুনা জেলার বেতাগী উপজেলার বদনীখালী বাজার সংলগ্ন ৬০ পরিবারের আবাসনের ১৫টি ঘর ইতোমধ্যে বিষখালী নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বেড়ী বাঁধের বাইরে বিষখালী নদীর চর ভরাট দিয়ে এই ৬০ পরিবারের আবাসন নির্মান করা হয়েছে। তাই সামান্য জোয়ারের পানিতে এই আবাসনের ঘর গুলো প্রায় সময়ই নিমজ্জিত থাকে। এ ব্যাপারে  আবাসনে বসবাসকারী জালাল মৃধা বলেন, স্যার দেখতেই পাচ্ছেন, আবাসনের অনেক ঘড় নদীর মধ্যে খালি খুটির উপর দাঁড়িয়ে আছে। আমরা যে কয়টি পরিবার এখানে বসবাস করছি অনেক ঝড় ঝাপটা মোকাবেলা করে কোন মতে বেঁচে আছি। মামান্য জোয়ারের পানিতে আবাসনের ঘরগুলোর মেঝে যখন এক দেড় ফুট পানিতে ডুবে যায় তখন খাওয়া দাওয়া কাজকর্ম ফেলে রেখে ঘর ছাড়তে বাধ্য হই। এ অভ্যাস আমাদের নিত্য দিনের। সিডর বা আইলার মতো ঘূর্ণীঝড় যদি আবার কখনো আসে তবে এখানকার আমরা সবকটি পরিবার প্রথম অবস্থাতেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবো। বর্ষা মৌসুমে ঝড়ের আশংকা সাধারনত একটু বেশি থাকে। সামনেই বর্ষা মৌসুম। তাই সব সময় আতংক নিয়ে এখানে বসবাস করছি। সরকারী এতো জমি থাকতে কেনো আমাদের এই নদী পাড়ে থাকার স্থান দিয়েছে এ প্রশ্নের জবাব আজও আমি খুঁজে পাইনি। তবে স্যার, গরীবের জান মালের জন্য কারও কোন মাথা ব্যাথা নেই এটাই সত্য।

বেড়ী বাঁধের বাইরে নদীর তীরে কেন আবাসন নির্মান করা হলো এ প্রশ্নের জাববে বরগুনার ৫ নং বুড়ামজুমদার ইউপির বর্তমান চেয়ারম্যান রেজাউল করিম সুমন বলেন, বেড়ী বাঁধের ভিতরে অনেক ফাঁকা জমি থাকতেও কেনো এই আবাসন নদীর তীরে নির্মান করা হয়েছে এ প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নেই। কারন আমি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পরে এই আবাসন নির্মান হয়নি এই আবাসন নির্মান করা হয়েছে সাবেক চেয়ারম্যান রফিকুল হায়দার বারেক মিয়ার সময়ে। তাই এ প্রশ্নের জবাব তিনিই যথাযথ ভাবে দিতে পারবেন । তিনি বলেন, আবাসনের এ দুরবস্থা আমি নিজ চোখে দেখে ৪০ দিন কর্মসূচীর আওতায় উত্তর পশ্চিম পাশে নদীর পাড় দিয়ে একটি বেড়ীবাঁধ দিয়েছিলাম, কিন্তু বালু মাটির জন্য পানির তোড়ে এই বাঁধটি বেশিদিন টিকে নাই। শুধু সিডর নয় সিডরের একশত ভাগের একভাগ শক্তিশালী বন্যাও যদি হয় তবে এই ৬০ ঘরের আবাসন মুহুর্তে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে এতে কোন সন্দেহ নাই।
কেনো নদী তীরে এই আবাসন নির্মান করার স্থান নির্বাচন করা হলো এ ব্যাপারে সাবেক চেয়ারম্যান রফিকুল হায়দার বারেক মিয়া বলেন, আমি চেয়ারম্যান থাকাকালীন সময় এই আবাসন নির্মান করা হলেও এর স্থান নির্বাচন করার জন্য তৎকালীন সময়ে বেতাগী উপজেলা পরিষদের উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার সমন্ময়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল, তারাই এই আবাসন নির্মান করার স্থান নির্বাচন করেছেন। এতে আমার কোন হাত ছিলো না। আবসনের প্রত্যেকটি ঘরের সিলিং এবং ফ্লোর পাকা থাকার কথা কিন্তু অধিকাংশ ঘরে তা নেই কেনো, এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, এটা শুধু ঠিকাদারই বলতে পারবে। তবে এটুকু আমি বলতে পারি এই আবাসন তৈরীতে ঠিকাদার যে কাজ করেছে তা অত্যন্ত নি¤œ মানের। এই নি¤œ মানের কাজ দেখে আপনি তাকে কেনো সাবধান করেননি এর  জবাবে তিনি বলেন, আমি বহুবার তাকে বলেছি কাজ ভালো করার জন্য কিন্তু সেতা না করে কাজ অসমাপ্ত রেখে কিভাবে বিল তুলে নিয়ে চলে গেলো তা আমি জানিনা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ব্যক্তি এ প্রতিবেদকে বলেন, এই আবাসন নির্মানে যে টাকা ব্যায় করার কথা তার অর্ধেকটাই সাবেক চেয়ারম্যান ও ঠিকাদারের পকেটে। তাই বুঝতেই পারছেন এখানে ভালো কাজ হবে কিভাবে?
এ আবাসনের দুরাবস্থার ব্যাপারে বেতাগী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলে তাকে পাওয়া যায়নি। পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে আবাসন গুলোর বাইরে থেকে বেড়ী বাঁধ নির্মান করা হবে বলে জানালেন জেলা প্রশাসক।

দক্ষিনাঞ্চলের সাগর পাড়ের আশ্রয়হীন এই অসহায় পরিবার গুলো যাতে একটু মাথা গোঁজার ঠাই পেয়ে পরিবার পরিজন নিয়ে নিশ্চিন্ত মনে বাঁচতে পারে সব সময় এই আশায় বুক বেঁধে আছে তারা। যে সব আবাসন ব্যারাক হাউজ নদীর পাড়ে নির্মান করা হয়েছে, নতুন কোনো বন্যা বা জলোচ্ছাসের আগেই আবাসনের বাইরে থেকে বেড়ী বাঁধ অথবা অন্য কোনো নিরাপদ স্থানে তাদেরকে স্থানান্তর করা হোক এমনটাই প্রত্যাশা আশ্রয়হীন এই দুঃখী পরিবারগুলোর।