মানিক মিয়ার ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী

বরিশাল টুডে ॥ আগামীকাল ১ জুন দৈনিক ইত্তিফাকের প্রতিষ্ঠাতা তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী। মানিক মিয়া বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য নাম। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতার পূর্ব পর্যন্ত প্রতিটি আন্দোলনে তার ভূমিকা ছিল ঈর্ষণীয়। তার লেখুনি সব সময় সাহস যুগিয়েছে সামনে পথ চলার। তার চিন্তা চেতনা বাঙালি গণমানুষকে দেখিয়েছে নতুন স্বপ্ন। আর সেই স্বপ্নের হাত ধরে একটি জাতি পেয়েছে নতুন দেশ।

মানিক মিয়ার জন্ম ১৯১১ সালে পিরোজপুর জেলার ভাণ্ডারিয়ার পূর্বভাণ্ডারিয়া গ্রামে। বাবার নাম মুসলেম উদ্দিন মিয়া। শৈশবেই তার মা মারা যান। গ্রামের পূর্ব ভান্ডারিয়া মডেল প্রাইমারি স্কুলে মানিক মিয়ার শিক্ষা জীবনের শুরু। ভণ্ডারিয়া হাই স্কুলে তিনি অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করেন। পিরোজপুর জেলা সরকারি হাই স্কুল থেকে তিনি কৃতিত্বের সাথে মেট্রিক পাশ করেন। ১৯৩৫ সালে মানিক মিয়া ডিস্টিংশনসহ বরিশাল বিএম কলেজ থেকে বিএ ডিগ্রি লাভ করেন। মেধাবী এই তরুণ ছোট থাকতেই সহপাঠীদের কাছে ক্ষুদে নেতা হিসাবে সমাদি্রত ছিলেন।

পিরোজপুর জেলা সিভিল কোর্টে মানিক মিয়া কর্মজীবন শুরু হয়। আত্মসম্মানবোধে মহিয়ান তরুণ মানিক মিয়া মুন্সেফের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণে চাকরি ছেড়ে দেন। তবে এই চাকরির সুবাদে তার সাথে পরিচয় হয়েছিল বরিশাল জেলা মুসলিম লীগ নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর। কোর্টের চাকরি ছেড়ে তিনি বরিশাল জেলা জনসংযোগ কর্মকর্তা হিসেবে কাজ শুরু করেন। পরে এ চাকরি ছেড়ে তিনি কলকাতার প্রাদেশিক মুসলিম লীগের অফিস সেক্রেটারি হিসেবে যোগ দেন। আর তখন থেকেই তিনি উপলব্ধি করলেন, বাংলার মানুষকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করে তুলতে বলিষ্ঠ গণমাধ্যমের প্রয়োজন। এই চিন্তা থেকেই তার উদ্যোগে ১৯৪৬ সালে আবুল মনসুর আহমেদের সম্পাদনায় বের হয় ‘দৈনিক ইত্তেহাদ’। ১৯৪৭ সালের আগস্টে ‘দৈনিক ইত্তেহাদ’-এর পরিচালনা পরিষদের সেক্রেটারি হিসেবে তিনি যোগ দেন। এ পত্রিকার সাথে তিনি দেড় বছরের মতো যুক্ত ছিলেন। দেশ বিভাগের পর থেকে পত্রিকাটি ঢাকায় স্থানান্তরের চেষ্টা করেন তিনি। কিন্তু তিনবার পত্রিকাটিকে পূর্ব পাকিস্তানে প্রবেশে বাধা দেয় পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী। শুধু তাই নয় পূর্ব পাকিস্তনে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয় পত্রিকাটিকে। শেষ পর্যন্ত পত্রিকাটি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন কর্তৃপক্ষ। মানিক মিয়াও তখন ঢাকায় চলে আসেন।

১৯৪৮ সালে দেশ ভাগ হওয়ার পর থেকেই শাসকগোষ্ঠী বাঙলা ভাষার গলা টিপে ধরে। রাষ্ট্রভাষা হিসাবে পশ্চিম পাকিস্তানিরা উর্দুকে প্রতিষ্ঠা করার পায়ঁতারা করে। ১৯৪৯ সালে মুসলীম লীগের বিরোধী প্রতিষ্ঠান হিসেবে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্ম হয়। এ দলের রাজনৈতিক মুখপত্র হিসেবে আবির্ভাব ঘটে সাপ্তাহিক দৈনিক ইত্তেফাক-এর। আবদুল হামিদ খান ভাসানী পত্রিকাটির আনুষ্ঠানিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫১ সালের ১৪ আগস্ট থেকে মানিক মিয়া এই পত্রিকার পূর্ণ দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ১৯৫৩ সালে তার সম্পাদনায় সাপ্তাহিক ইত্তেফাক দৈনিক ইত্তেফাকে রূপান্তরিত হয়। স্বাধীনতার পক্ষে, গণমানুষের স্বপ্ন ও অধিকারের কথা বলায় তার ওপর নেমে আসে জেল-জুলুম। সামরিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে ১৯৫৯ সালে তিনি এক বছর জেল খাটেন। কিন্তু তার চিন্তাকে, গণমানুষের পক্ষে তার লেখুনিকে থামিয়ে দিতে পারেনি সামরিক সরকার। ১৯৬৩ সালে তিনি আবার গ্রেফতার হন। এ সময় দৈনিক ইত্তেফাকের প্রকাশনা নিষিদ্ধ এবং নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করা হয়। ফলে তার প্রতিষ্ঠিত অন্য দুটি পত্রিকা ঢাকা টাইমস ও পূর্বাণী বন্ধ হয়ে যায়। গণআন্দোলনের মুখে সরকার ইত্তেফাকের ওপর বিধি-নিষেধ প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। ফলে ১৯৬৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি পত্রিকাটি আবার প্রকাশিত হয়। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শোষণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সৃষ্টির লক্ষ্যে তিনি ইত্তেফাকে ‘মোসাফির’ ছদ্মনামে নিয়মিত উপসম্পাদকীয় লিখতেন। ১৯৬৩ সালে তিনি আন্তর্জাতিক প্রেস ইন্সটিটিউট পাকিস্তান শাখার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ১৯৬৯ সালে ২৬ মে এই তিনি প্রাতিষ্ঠানিক কাজে রাওয়ালপিন্ডি যান। সেখানে ১ জুন রাতে এই নির্ভীক সাংবাদিক মারা যান।