রমজান আলীর সর্বনাশ

মাসুদ আমিন ।।
রাত গভীর,প্রায় দুটো বাজে। রমজান আলী বেডরুমের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছেন,আনমনে। মনটা বড্ড এলোমেলো হয়ে আছে । নিজের প্রিয় ড্রিংকস টমেটো জুসে আবার একটু চুমুক দিলেন। ভাবলেন এইটাতে যদি কিছু হয়। কারন তিনি তার  জীবনের অনেক কঠিন সিদ্ধান্ত  প্রিয় ড্রিংকসটাতে চুমুক দেয়ার পর নিতে পেরেছেন।  দীর্ঘ  অনেক  বছর ধরে এই ড্রিংকসটা তার সাথে আছে। কখনো বিলম্ব করেনি কোন সমস্যার সমাধান দিতে। তাহলে আজ পারছে না কেন। এইসব ভাবতে ভাবতে তার চোখ গেল বিছানায় শুয়ে থাকা মেয়েটার দিকে। কেমন আলুথালু হয়ে  শুয়ে আছে। কি অসহায়ই তাকে না লাগছে।  আজ দুই  বছর হয় তারা একসাথে আছে। এই গভীর নিষুতি রাতে কেন জানি পাশের মেয়েটার দিকে তাকিয়ে থাকতে রমজান আলীর বুক ফেটে যাচ্ছে। ভীষন কষ্ট লাগছে। অনেক নিস্পাপ লাগছে ওকে। অনেক। আজ এই রাতে সব অতীত কেন জানি ভেসে ভেসে আসছে রমজান আলীর চোখের সামনে। সারাদিন তিনি পরে থাকতেন আড্ডা মাস্তি আর বন্ধুদের সাথে নেশা নিয়ে। কিন্তু নারীঘটিত কোনো নেশার বালাই তার মধ্যে ছিল না। কোন এক বছরের থার্টিফাষ্ট নাইট। তিনি তার ইয়ার বন্ধুদের নিয়ে  প্ল্যান করলেন এইবারের থার্টিফাষ্ট নাইট অনেক কঠিনভাবে সিলেব্রেট করবেন। তাই বিকেল গড়াতেই বন্ধুদের নিয়ে চললেন কার্জন হলের দিকে।  সবুজ চত্বরে একটা জায়গায় তারা সবাই গোল হয়ে বসে আড্ডা দিতে লাগলেন। সাথে হালকা খানাপিনা।  তবে ড্রিংকস তখনো শুরু হয়নি। ওটা রাত আরেকটু গভীর হলে হবে। রমজান আলী অনেকক্ষন যাবত খেয়াল করে দেখছেন যে পাশে কোথায় যেন বাচ্চাদের হৈ হুল্লোড় হচ্ছে। বিরক্ত হয়ে চোখ ফেরাতেই দেখলেন অসম্ভব রূপসী  একটা মেয়ে অনেকগুলা বাচ্চার সাথে মজা করছে। তিনি চোখ ফেরাতে পারছিলেন না। মুগ্ধ হৃদয় নিয়ে প্লাবিত হতে লাগলেন। মানুষ এতো সুন্দর হয়। তার অনেক ভালো লাগছিল তাকিয়ে থাকতে।  কতো সময় পর কে জানে বন্ধুদের ধাক্কায় তার হুশ আসে। তখনো তিনি ঘোরের ভিতর। বন্ধুরা তো মহা তাজ্জব। তারা ভেবে পাচ্ছিল না যে লোক কোনো মেয়ের দিকে কোনদিন তাকায়নি, আজ তার কি হলো। রমজান আলী নেশাগ্রস্ত মানুষের মতো  ধীরলয়ে হেটে মেয়েটার কাছে গেলেন। গিয়ে চুপচাপ ওদের আসরে সামিল হলেন। খেয়াল করলেন মেয়েটি মাঝে মাঝে তার দিকে আড়ে আড়ে তাকাচ্ছে। অনেক সময় পর সবাই যখন ক্লান্ত হয়ে বিশ্রাম করতে বসলো, তখন রমজান আলী নিজের পরিচয় দিয়ে আলাপ শুরু করলেন। জানলেন মেয়েটির নাম বিথী,ও চারুকলার ছাত্রী। ও ওর কাজিনদের বাচ্চাদের নিয়ে এসেছে কার্জন হল দেখাতে। টুকটাক আলাপের পর তিনি আবার দেখা হবে বলে বিদায় নিয়ে চলে আসলেন। বিথী ছোট করে বললো,’ভালো থাকবেন’। তাতেই রমজান আলী ধন্য হয়ে গেলেন। এরপর প্রতিদিন তিনি চারুকলায় ঢু মারতে লাগলেন। কিন্তু নেই তো নেই একদম হাওয়া হয়ে গেছে বিথী। ভাবলেন মেয়েটি কি তার সাথে ছল করলো। রমজান আলীর অবস্থা তখন ত্রাহি মধুসূদন।  নাওয়া নেই,খাওয়া নেই, নেই আড্ডা মাস্তি। তার চারদিকে শুধু হাহাকার। নেই, নেই বিথী নেই। অনেকদিন বাদে বইমেলায় তিনি যখন বিষন্ন মনে ঝিম মেরে বসে ছিলেন আসরে, হঠাত দেখলেন একটা মেয়েকে। মনে হলো বিথীই। তিনি ছুটে গিয়ে তার সামনে দাড়ালেন, দেখলেন বিথীই, ঘোর লাগা কন্ঠে শুধালেন, চিনতে পারছেন আমাকে ? ও বললো, স্যরি ? মনে করতে পারছি না। রমজান আলী বললেন, ওকে সমস্যা নেই। মনে করিয়ে দিচ্ছি।  থার্টিফাষ্ট ডিসেম্বর, কার্জন হল, আপনার সাথে দেখা হয়েছিল। অনেক পিচ্চি ছিল আপনার সাথে। ওহো, চিনতে পেরেছি। কেমন আছেন? আপনার নামটা যেন কি? বলে ও খিলখিল করে হাসতে লাগলো।
রমজান। ‘ইয়েস,রমজান আলী। নামটা একটু ওল্ড ডেটেড’ , বলে ও আবার  হাসতে লাগলো। হাসি তো নয় যেন মুক্তো ঝরছে। তা আপনি কেমন আছেন,আপনার এই অবস্থা কেন ?  জ্বি, আছি এক রকম। আচ্ছা, চলুন না কোথাও গিয়ে বসি। একটু চা খাই, বললেন রমজান আলী। বিথী কিছুটা ইতস্তত করে রাজী হলো। হয়তো ভাবলো ভার্সিটিতে পড়ি, না বললে ভাববে সেকেলে। এইভাবেই শুরু হলো ওর সাথে রমজান আলীর সম্পর্ক।  পরিচয়, ঘুরতে যাওয়া, বন্ধুত্ব, প্রোপোজ, প্রথমে না বলা , পরে মেনে নেয়া। প্রথম দিকে বিথী জানতো না যে সে নেশা করে। তিনিও বুঝতে দিতেন না। কিন্তু একদিন কিভাবে যেন ও জেনে গেল। মনে হয়  বন্ধুদের কেউ বলে দিয়েছে। সম্ভবত ঈর্ষার কারনে। এরপর স্বাভাবিকভাবেই তুমুল  ঝগড়া, রাগারাগি, কান্নাকাটি । শেষতক ও বললো, তুমি খারাপ, তুমি ভন্ড। তুমি আর কখনও আমার সাথে যোগাযোগ করবে না। তোমার লজ্জা করে না আমার জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে। এইসব বলে ও চলে গেল। এরপর অনেক দিন বিথীর সাথে রমজান আলীর আর যোগাযোগ হয়না।  ফোন দিলেও রিসিভ করে না। ক্যাম্পাসেও আসে না। রমজান আলী হতাশায় ডুবে যেতে থাকেন। চড়তে থাকে নেশার মাত্রা। তিনি ঠিক করেছিলেন বিথী যদি মাফ করে দেয় তাহলে তিনি নেশার জগত থেকে ফিরে আসবেন। কিন্তু তা আর হলো কই। হঠাত একদিন দুপুরবেলা ওর নাম্বার থেকে কল আসলো।  হ্যালো, তুমি কই? আমি তো বাসায় । কেন, কি দরকার ? তুমি থাকো। আমি আসছি।
তুমি আসবে কেন? কোন কথা বলবে না। আমি আসছি।  প্রায় ঘন্টা খানিক টেনশনে ডুবিয়ে রেখে ও আসলো। এসেই খাটে  ধপ করে বসে পড়লো। রমজান আলী স্বাভাবিক কন্ঠে জানতে চাইলেন, কি হয়েছে? ও বললো,কিছু না। আমাকে একটু
পানি দাও। পানি খেয়ে অনেকক্ষন পর ও বললো,আমি বাসা থেকে বের হয়ে এসেছি। রমজান আলী বললেন,মানে কি ?  কি হয়েছে? ও বললো, আমি এখন এ্যাডিক্টেড। আমার জিনিস লাগবে। টাকা নেই, তাই জোগাড়  করতে পারছিনা। রমজান আলীর মাথায় যদি থান্ডারিং হতো তাহলেও হয়তো তিনি এতো অবাক হতেন না। একবারেই ধরা ছেড়ে চলে যেতেন। তার মাথা এলোমেলো হয়ে যেতে লাগলো। প্রচন্ড পিপাসা পেলো। হাতপা থরথর করে কাঁপতে লাগলো। অনেক সময় পর একটু থিতু হয়ে জানতে চাইলেন, কি বলতেছো তুমি এইসব, তোমার মাথা কি ঠিক আছে?
ও বললো, জ্বী স্যার, আমার মাথা ঠিক আছে। তোমার কাছ থেকে যাওয়ার পর আমি অনেক কষ্ট পেয়েছি। এলোমেলো হয়ে যাই। তাই তোমার উপর রাগ করে কষ্ট ভুলে থাকতে চেয়েছিলাম। তাই কিভাবে যেন  জিনিসটার সাথে নিজেকে জড়িয়ে ফেলি। কিন্তু গলা পর্যন্ত ডুবে যাবো ভাবতে পারি নি। কষ্ট ভুলে থাকতে গিয়ে আজ আমি তোমার মতো।

এখন বলো আমাকে তোমার সাথে থাকতে দিবে কিনা? কোনো কিছু না ভেবেই রমজান আলী  রাজি হয়ে গেলেন। সামনে কি হবে না হবে তা ভাগ্যের উপর ছেড়ে দিলেন। সেই থেকে আজ পর্যন্ত তারা এক সাথে আছেন। এক সাথে নেশার জগতে হাবুডুবু খান। একদিন ভোর রাতে বিথী তীব্র বুক ব্যথা নিয়ে ঘুম থেকে জেগে উঠলো। ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবার পর রমজান আলী যা  শুনলেন তাতে তার বুক কেঁপে উঠলো। ব্রংকাইটিস এর পাশাপাশি লিভার কিডনী ড্যামেজ হবার পথে ওর ভালোবাসার। আরো শুনলেন তিনি  বাবা হতে যাচ্ছেন। তিনি বুঝতে পারছিলেন না কি করবেন। হাসবেন না চীৎকার করে কাঁদবেন। তিনি বিথীর শয্যাপাশে গেলেন। ও বোবার মতো ফ্যালফ্যাল চোখে তার দিকে তাকিয়ে থাকলো। হয়তো ভাবছে, রমজান আলী তুমি শেষ করে দিলে আমার বাবুর জীবনটাকে,আমাকেও। ওকে আজ অনেক ম্রিয়মাণ লাগছে। এক সময় ওর চোখ দিয়ে জল গড়াতে লাগলো। কষ্টে রমজান আলীর বুক ফেটে চৌচির হতে লাগলো। হয়তো রমজান আলী বিথীর বেদনা বুঝতে পারলেন। তাই তিনি ওর চোখের জল হাতে নিয়ে ওর হাত ধরে প্রতিজ্ঞা করলেন, নেশার জগত থেকে ফিরে আসবেন। কিন্তু তিনি দেখেননি  বিধাতার করুন হাসি। কিছুটা সুস্থ হবার পর তিনি বিথীকে বাসায় নিয়ে আসলেন। নেশাও ছাড়লেন দুজনে। কিন্তু হঠাত নেশা ছাড়ার দরুন বিথীর নানা উপসর্গ দেখা দিতে লাগলো। ঘুম না হওয়া, হঠাত খিচুনী, শরীর ফুলে যাওয়া, হঠাত হঠাত তীব্র বমি। হাই ডোজের সিডেটিভ দিয়েও বিথীকে সুস্থ রাখা যাচ্ছে না। দিন দিন মেয়েটা কাহিল হয়ে যেতে লাগলো। তীব্র অনুশোচনায় রমজান আলীও কাহিল হতে লাগলেন। অবস্থা শেষ পর্যন্ত এমন দাড়ালো যে ডাক্তার বাধ্য হলেন সিজার করতে।  কিন্তু বিথীর অবস্থা অনেক খারাপ। সিউর করে কিছু বলা যাচ্ছে না কে বাঁচবে, মা না শিশু। নাকি কেউই না।  প্রায়  ঘন্টা দুয়েক পর অপারেশন শেষ হলো। ফুটফুটে একটা মেয়ে হয়েছে। কিন্তু মা মেয়ে দুজনের অবস্থাই অনেক খারাপ। যমে জানে টানাটানি চলছে। প্রায় এক ঘন্টা পর ডাক্তার এসে বললেন যে রোগীর অবস্থা ভালো না কিন্তু জ্ঞান ফিরেছে। একবার গিয়ে দেখে আসুন। রমজান আলী দৌড়ে তার কাছে গেলেন। তার বিথী তার দিকে বোবা চোখে তাকিয়ে আছে। রমজান আলী কি করবেন বুঝে উঠতে পারছেন না। তিনি ব্যথাবেদনায় ফানাফানা হয়ে যেতে লাগলেন। এতো কষ্ট,এতো কষ্ট। অনেক কষ্টে তিনি ওর হাত ধরলেন। বলতে চাইলেন,“তোমার কিচ্ছু হবে না, লক্ষীটি ”,কিন্তু গলা দিয়ে কোনো স্বর বের হচ্ছে না। হঠাত অনুভব করলেন, তার ভালোবাসা  নিথর হয়ে গেছে। বুঝলেন  সব শেষ । বিথী তাকে ছেড়ে চলে গেছে। তার জন্য গ্রহন করা মাদক তাকে তার কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে গেল। তার মরে যেতে  ইচ্ছে করছিল। তিনি আকুল হয়ে কান্না করতে লাগলেন। বাচ্চার কথা মনে আসতেই ছুটে গেলেন তার কাছে। ইনকিউবেটরে  শুয়ে আছে। কি নিস্পাপ কোমল মুখ। তার মা তাকে দেখে যেতে পারলো না। প্রিয়তমাকে হারিয়ে তিনি বাচ্চাটার কাছে আশ্রয় চাইলেন। ওকে নিয়ে বাঁচতে চাইলেন। শিশুটিকে  কোলে নিলেন। কিন্তু একি, বাচ্চার শরীর বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে আছে। রমজান আলীর মন চাইছিলো ধরনি দুই ভাগ হয়ে যাক।তিনি তাতে নিজেকে লুকান। তার সবকিছু ওলোটপালোট হয়ে গেছে। তিনি কান্না ভুলে হাসতে লাগলেন। হাসতে হাসতে তার চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় নীল বেদনা ঝরতে লাগলো। মনে হলো তিনি যেন শুনছেন লীলাবতী কন্যার অভিসম্পাত, “তোমার জন্য আজ আমাদের ঝরে যেতে হলো।  কখনো ক্ষমা পাবে না তুমি”।